একদা ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ও পরে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’-এর স্বপ্ন দেখা তথ্যপ্রযুক্তি খাত আজ এক ক্রান্তিকালের সম্মুখীন। যে খাতকে দেশের অর্থনীতির নতুন চালিকা শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং তার আগে-পরের কিছু ঘটনায় সেই চাকা যেন থমকে গেছে। নেতৃত্ব সংকট, অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার অভাবে দেশের সম্ভাবনাময় এই খাতটি এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে। এই পরিস্থিতিকে খাতটির সঙ্গে জড়িত অনেকেই ‘তথ্যপ্রযুক্তির কালো অধ্যায়’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
সংকটের শুরুটা হঠাৎ করে হয়নি, তবে এর তীব্রতা অনুধাবন করা যায় কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতির মাধ্যমে। ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই মধ্যরাত থেকে দেশব্যাপী মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা ছিল তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জন্য এক ভয়াবহ ‘অশনিসংকেত’। আধুনিক যুগে ইন্টারনেট ছাড়া একটি মুহূর্ত কল্পনা করা যেখানে অসম্ভব, সেখানে দিনের পর দিন ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল।
আরও পড়ুন
একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন
এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় ও করুণ শিকার হন দেশের লাখো ফ্রিল্যান্সার বা মুক্ত পেশাজীবী। যাঁদের রুটিরুজি সম্পূর্ণভাবে ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল, তাঁরা হঠাৎ করেই বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। বিদেশি গ্রাহকদের (ক্লায়েন্ট) সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় বছরের পর বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে তোলা আস্থা ও পেশাদারত্বের সম্পর্কগুলো মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। কাজ বুঝিয়ে দিতে না পারা, নতুন কাজের সুযোগ হারানো এবং তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন অসংখ্য তরুণ। যদিও কয়েক দিন পর ইন্টারনেট সেবা আংশিকভাবে ফিরে আসে, কিন্তু তার ধীরগতি ও অস্থিরতা কাজের পরিবেশকে স্বাভাবিক করতে পারেনি। এই একটি ঘটনাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, আমাদের তথাকথিত শক্তিশালী ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত্তি আসলে কতটা নড়বড়ে ও ভঙ্গুর।
সে সময় ক্ষোভ প্রকাশ করে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবসায়ীরা বলেছিলেন, ‘আমরা ক্ষোভ থেকে কথা বলছি। কারণ, ইন্টারনেট না থাকায় আমাদের ব্যবসায় অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। এখন আমাদের একটাই চাওয়া সুন্দর, রাজনীতিমুক্ত এবং আইসিটিবান্ধব একটি বাংলাদেশ গড়া।’
ইন্টারনেট বন্ধের ক্ষতি যখন দৃশ্যমান, তখন এই খাতের অভিভাবক হিসেবে পরিচিত সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও ঘোলাটে করে তোলে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব একপ্রকার স্থবির হয়ে পড়ে, যা সাধারণ সদস্যদের মধ্যে হতাশার জন্ম দেয়।
দেশের সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসে (বেসিস) অচলাবস্থা বর্তমানে চরমে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে শুরু হওয়া অস্থিরতা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং সময়মতো নির্বাচন আয়োজনে ব্যর্থতা সংগঠনটিকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। নেতৃত্বহীন এই পরিস্থিতিকে সাধারণ সদস্যরা বেসিসের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ‘কালো অধ্যায়’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই বেসিসের কার্যনির্বাহী কমিটিতে ফাটল ধরে। তৎকালীন সভাপতির বিরুদ্ধে পূর্ববর্তী সরকারের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ উঠলে সদস্যদের একটি অংশ তাঁর পদত্যাগের দাবিতে সোচ্চার হন। চাপের মুখে তিনি পদত্যাগ করলে সংকট সমাধানের বদলে আরও ঘনীভূত হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একজন অতিরিক্ত সচিবকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিলেও অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে মতবিরোধের জেরে গঠিত সহায়ক কমিটিও টিকতে পারেনি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করতে না পারা এবং প্রশাসকের পদত্যাগ—সব মিলিয়ে বেসিস আজ আক্ষরিক অর্থেই অভিভাবকহীন। সাধারণ সদস্যদের ক্ষোভের জায়গাটি হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও আলোচনার মাধ্যমে যে সমস্যার সমাধান সম্ভব ছিল, তা আজ ইগোর লড়াইয়ে পরিণত হয়ে সংগঠনটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।
পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয় এবং ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের দ্বিবার্ষিক নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণা করা হয়। গত ৫ এপ্রিল নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান তানিয়া ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল ২৭ জুন বেসিসের নির্বাচন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে নির্ধারিত সেই দিনেও ভোট গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। এমনকি নির্বাচনকে ঘিরে জমা পড়া মনোনয়নপত্রগুলোও একপর্যায়ে রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যায়! কীভাবে বা কাদের ইশারায় এগুলো নিখোঁজ হলো, তার স্পষ্ট কোনো উত্তর আজ অবধি মেলেনি।
মনোনয়নপত্র উধাও হওয়ার এই নজিরবিহীন ঘটনার পর আবারও নির্বাচনের পুনঃ তফসিল ও আচরণবিধি ঘোষণা করেছে সংগঠনটি। নতুন তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর বেসিসের বহুল প্রতীক্ষিত এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বেসিসের একাধিক সাধারণ সদস্য আক্ষেপ করে জানিয়েছেন, কোনো একটি অদৃশ্য শক্তি বারবার বেসিসকে বিতর্কিত ও অকার্যকর করার চেষ্টা করছে। এটি মূলত সফটওয়্যার ব্যবসায়ীদের পেশাদার সংগঠন হলেও এখানে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সামগ্রিক খাতটিকে পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সদস্যরা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করছেন, অথচ সাধারণ সদস্যদের সিংহভাগই একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চান।
নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব তানিয়া ইসলাম এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘কোনো রকম অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে, সেই কারণে এবার আমরা সচিবালয়ে মনোনয়নপত্র জমা নিচ্ছি। আমরা তিন সদস্যের কমিটি বসে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং আমাদের একমাত্র লক্ষ্য একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়া। ইতিমধ্যেই আমরা নতুন তফসিল ঘোষণা করেছি এবং আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠানের সব প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।’
অন্যদিকে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের পুরোনো সংগঠন বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস) ভিন্ন এক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এখানে নেতৃত্বের কোন্দলের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থনৈতিক প্রতিকূলতা। দেশে