বিদেশি নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে এক ব্যবসায়ীর কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়, না দিলে হুমকি দেওয়া হয় প্রাণে মেরে ফেলার। ওই ব্যবসায়ী ছিলেন দক্ষিণ কমলাপুরে কোরবানির পশুর হাটের ইজারাদার। টাকা না দেওয়ায় চার দিনের মাথায় তাঁর কার্যালয়ে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে। এই ঘটনা নিয়ে পুলিশের তদন্তে উঠে আসে রাজধানীর মতিঝিল এলাকার ‘সন্ত্রাসী’ তানিম রেজা ওরফে বাপ্পির নাম।

পুলিশের দাবি, মতিঝিল, আরামবাগ ও কমলাপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অপরাধজগতে আলোচিত নাম তানিম রেজা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ও পরিচয় বদলালেও বদলায়নি অপরাধের ধরন। দরপত্র নিয়ন্ত্রণ, পরিবহন, ফুটপাত, ময়লা, ইন্টারনেট ও কেব্‌ল ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাতে আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

আজ রাতেই অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছেন নাহিদ, আগে যাচ্ছেন তাসকিনও আরও পড়ুন আজ রাতেই অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছেন নাহিদ, আগে যাচ্ছেন তাসকিনও

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, মতিঝিল, মগবাজার, মালিবাগ, কমলাপুরসহ আশপাশের এলাকায় গুলি, চাঁদাবাজি এবং শীর্ষ সন্ত্রাসীদের হয়ে কাজ করার নানা ঘটনায় তানিম রেজার নাম এসেছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে।

পুলিশের দাবি, কেউ চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে নিজস্ব ‘শুটার বাহিনী’ দিয়ে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে ভয় দেখাতেন তানিম রেজা। সাত থেকে নয়জনের একটি অস্ত্রধারী দল সব সময় তাঁর সঙ্গে থাকত। তানিমও নিজেও অস্ত্র রাখতেন।

বিজ্ঞাপন

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তানিম রেজা যুবলীগের প্রভাবশালী নেতাদের হয়ে দরপত্র নিয়ন্ত্রণে কাজ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর কাজ ছিল ঠিকাদারদের অস্ত্রের ভয় দেখানো, চাঁদা আদায় এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের দরপত্র থেকে সরিয়ে দেওয়া।

পুলিশের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিএনপির একজন জ্যেষ্ঠ নেতার ভাইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন তানিম। এরপর নিজেকে যুবদলের নেতা হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন এবং ওই পরিচয়ে মতিঝিল, আরামবাগ ও কমলাপুর এলাকায় নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ওই সময় থেকে বাস কাউন্টার, ফুটপাত এবং বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করতেন তানিম। কমলাপুরের ব্রাহ্মণবাড়িয়া এক্সপ্রেস বাস কাউন্টার থেকে নিয়মিত চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। পাশাপাশি ঢাকা–কুমিল্লা রুটে চলাচলকারী রয়েল কোচ পরিবহনের শেয়ারের একটি অংশ দখলে নিয়ে ব্যবসায় নামেন তিনি।

শুধু ব্যবসায়ী নন, মতিঝিল থানা বিএনপির কয়েকজন নেতা-কর্মীকেও ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ আছে তানিমের বিরুদ্ধে।

তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মতিঝিল এলাকায় ময়লা–বাণিজ্য, ফুটপাত, ফ্ল্যাট, ইন্টারনেট ও ডিশ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে সম্পৃক্ত ছিলেন তানিম রেজা। সরকার পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ–ঘনিষ্ঠ কয়েকজন পলাতক ব্যক্তির ব্যবসার নিয়ন্ত্রণও তিনি নেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।

পুলিশের ভাষ্য, মতিঝিল, সবুজবাগ ও কমলাপুর এলাকায় চাঁদাবাজি, দরপত্র নিয়ন্ত্রণ এবং অস্ত্রের ব্যবসাও তাঁর নির্দেশে পরিচালিত হতো। এসব কর্মকাণ্ডে মতিঝিলের আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী ইখতিয়ারের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। একইভাবে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের নাম আসা বিভিন্ন অপরাধের ঘটনাতেও কোনো না কোনোভাবে তানিম রেজার সম্পৃক্ততা পেয়েছে পুলিশ।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদের সহযোগী হিসেবে ২০০২ সালে মতিঝিল এলাকায় অপরাধজগতে প্রবেশ করেন তানিম রেজা। জিসান দেশ ছেড়ে এখন আছেন দুবাইয়ে।

জিসানের সহযোগী হিসেবে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার সঙ্গে দরপত্র নিয়ন্ত্রণে তানিম সহযোগী ছিলেন। দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিদ্বন্দ্বী ঠিকাদারদের তাঁরা অস্ত্রের ভয় দেখাতেন বলে দাবি করেছে পুলিশ।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, তানিম রেজাদের এই সশস্ত্র তৎপরতার কারণেই গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঠিকাদার ও বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা জি কে শামীম এবং খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া দীর্ঘ সময় দরপত্র নিয়ন্ত্রণে নিজেদের রাখতে পেরেছিলেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বর্তমানে দুবাইয়ে অবস্থানরত জিসান এবং আরেক পলাতক সন্ত্রাসী মোল্লা মাসুদের সঙ্গে এখনো তানিম রেজার যোগাযোগ থাকার তথ্য–প্রমাণ পাওয়া গেছে।

পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য সাত থেকে নয়জনের একটি ‘শুটার বাহিনী’ গড়ে তুলেছিলেন তানিম রেজা। বাহিনীর সদস্যদের কাছে অন্তত সাতটি ভারতীয় আগ্নেয়াস্ত্র ছিল বলে তদন্তে তথ্য পেয়েছে পুলিশ। ব্যবসায়ী বা প্রতিপক্ষকে ভয় দেখাতে প্রয়োজন হলে তাঁদের দিয়ে গুলি চালানো হতো।

তানিমকে গ্রেপ্তারের পর ইস্টার্ন কমলাপুর হাউজিংয়ের একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে তিনটি বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি, একটি ইলেকট্রিক শক গান ও একটি কুড়াল উদ্ধারের কথা এরই মধ্যে জানিয়েছে পুলিশ। গত শুক্রবার তানিমের পাশাপাশি রাকিবুল ইসলাম ভূঁইয়া ওরফে রিজন (৩৫) নামে আরেকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তানিমের হয়ে মাঠপর্যায়ে চাঁদা আদায় ও বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিতেন রাকিবুল ইসলাম। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতেন লিখন ও জাহিদ হাসান নামের দুজন। আদর ও জিতু নামের দুজন শুটার ভয় দেখাতে গুলি চালানোর কাজে অংশ নিতেন।

লিখন, জাহিদ, আদর ও জিতুকে গ্রেপ্তারেও অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশের তথ্য বলছে, গত ১৫ মে বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে দক্ষিণ কমলাপুরে কোরবানির পশুর হাটের ইজারাদার ইসমাইল হোসেনের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না পেয়ে ১৯ মে তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘এআই কার্গো সার্ভিস’–এ একদল সন্ত্রাসী গুলি চালায়। এ ঘটনায় মতিঝিল থানায় মামলা হওয়ার পর তদন্তে তানিম রেজা ও তাঁর সহযোগীদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়।

এরপর ১৮ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ ওসমান গণি বলেন, ঘটনার পর তানিম রেজা ও তাঁর সহযোগীরা আত্মগোপনে চলে যান। প্রায় দুই মাসের চেষ্টার পর ১৭ জুলাই সকালে রাজধানীর পূর্বাণী হোট