‘নিজের কাজের ওপর বিশ্বাস রাখা জরুরি। আমরা হয়তো ভবিষ্যৎ দেখতে পারি না, কিন্তু আমাদের কাছে “অতীত” আছে। সেই অতীত আমাদের কাজের নানা ধরন, মডেল, তুলনামূলক ধারণা, নীতি ও অনুপ্রেরণার রসদ দেয়। সেখানে সাহসিকতা, মেধা আর ধৈর্যের অগণিত বীরত্বগাথা রয়েছে। আর রয়েছে সেই গভীর আনন্দ, যা কেবল মহৎ কোনো কাজের মাধ্যমেই পাওয়া যায়। এসব সম্পদকে সঙ্গী করেই আমরা আগামীর নতুন সম্ভাবনাগুলোকে আঁকড়ে ধরতে পারি এবং আমাদের স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে পারি।’
৯ বছর আগে দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় বিশিষ্ট কলামিস্ট রেবেকা সোলনিট তাঁর একটি জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধের সমাপ্তি টেনেছিলেন এই অনুচ্ছেদ দিয়ে। গভীর ও দীর্ঘ চিন্তাভাবনার মধ্য দিয়ে সোলনিট গুরুত্বের সঙ্গে জোর দিয়েছিলেন ‘আশা’ রাখতে, তা এই জন্য নয় যে এটি আমাদের এমন কিছু দেয়, যা আমরা স্বপ্নে দেখতে অভ্যস্ত, বরং আশা হলো মানুষের এক অবোধ্য অভ্যন্তরীণ তাগিদ, যা মানুষ তখনই অনুভব করে যখন সে নিজেকে উপলব্ধি করে একগাদা প্রতিশ্রুতির জমিনে, যার আকাশ একরাশ কালো সংকটের মেঘে ঢাকা। সেই মেঘ শুধু জমিন নয়, সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মতো রাশি রাশি আকাঙ্ক্ষাকে গ্রাস করে।
আরও পড়ুন
একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন
একদা খ্যাতনামা ফরাসি ঐতিহাসিক ফার্নান্দ ব্রদেল ইতিহাসের ধীর-বিবর্তনশীল প্রকৃতির ওপর জোর দিয়েছিলেন, যেখানে তিনি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামোকে রূপদানকারী কিছু মৌলিক অদৃশ্য উপাদানগুলোর গুরুত্ব তুলে ধরেন। ব্রদেল জলবায়ু, ভূগোল, ভূতত্ত্ব ও কিছু শর্তহীন প্রাকৃতিক চলকের প্রভাবকে চিহ্নিত করেছেন, যা পরিবর্তনের গতিপথকে প্রভাবিত করে এবং যা কেবল ইতিহাসের কোনো এক পর্যায়ে এসে উপলব্ধি করা যায়। অথবা একে জার্মান দার্শনিক হেগেলের মিনার্ভার কাহিনির সেই বিখ্যাত দার্শনিক রূপকের মাধ্যমেও বোঝা যেতে পারে, যেখানে বলা হয়েছে, ‘মিনার্ভার প্যাঁচা কেবল গোধূলির আগমনেই তার ডানা মেলে।’ ব্রদেলের মতো হেগেলও ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণের ঘটনা-বাহুল্যের ওপর জোর দিয়েছিলেন, যা কেবল তাঁর নিজস্ব আত্ম-উপলব্ধির মাধ্যমেই অনুধাবন করা সম্ভব। সোলনিট যেমনটা বলেছিলেন, আমরা ভবিষ্যৎ জানি না এবং আমরা ভবিষ্যৎকে কেবল তখনই জানতে পারি, যখন তা আর ভবিষ্যৎ হিসেবে থাকে না।
অন্য কথায়, যেকোনো বিষয়ের ভবিষ্যৎ রূপটিই সর্বদা অধরা থেকে যায়। হেগেল যেমনটি ইতিহাসের দর্শনের ওপর তাঁর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতামালায় উল্লেখ করেছিলেন, তত্ত্ব (আকাঙ্ক্ষা) ও বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধানই হলো ইতিহাসের মূল চালিকা শক্তি। এই দুইয়ের মধ্যে সর্বদা রয়ে যায় এক ব্যবধান, ফাটল, পার্থক্য। আর এটিই সেই যৌক্তিকতার ভিত্তি গড়ে তোলে, যা ইতিহাসের ইঞ্জিনকে চালিত করে। হেগেলের মতে, বাস্তবতা সব সময় যুক্তিসংগত। কারণ, বাস্তবতা বড়ই ঐতিহাসিক।
হেগেল হয়তো অতিরিক্ত মাত্রায় বিমূর্ত ছিলেন এবং তাঁর বিপরীতে মার্ক্সসহ সে যুগের বহু বিখ্যাত চিন্তাবিদ ইতিহাসের সাধারণ গতিপথকে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে মূর্তভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন, যাতে মানুষ একে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখতে পারে। কিন্তু এই বিন্দুতে এসে হয়তো হেগেলই সঠিক ছিলেন যে আমরা যত বেশি বিশুদ্ধ সত্যকে জানতে চাইব, তত বেশি বিমূর্ততার মুখোমুখি হব। তাই মূর্ত বা বাস্তব ইতিহাস জানার পরিধির মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখাই শ্রেয় হবে, যা সোলনিটের মতে, আমাদের অন্তত একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার অন্বেষণে আরও বেশি সক্রিয় হতে শেখাতে পারে।
আমরা আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, ঠিক যেমনটি আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মগুলো দাঁড়িয়ে ছিল। একদিক থেকে আজ আমরা যা কিছু প্রত্যক্ষ করছি, তার অনেক কিছুই একেবারেই নতুন; আবার অন্যদিক থেকে অনেক কিছুই পরিবর্তনাতীত রূপেই রয়ে গেছে। আমাদের নিজেদের সামাজিক বাস্তবতাকে পশ্চিমা সমাজের বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা আমাদের মধ্যে কাজ করে। এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা যে বিষয়টি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হই, তা হলো যে সমাজগুলোকে আমরা সাধারণত আদর্শ বা মডেল হিসেবে ধরে নিই, সেগুলোর বিবর্তনের ইতিহাসকে আমরা বুঝতে চেষ্টা করি না। গণতন্ত্র, আইনের শাসন, সমান অধিকার ও নাগরিক অধিকারের প্রসঙ্গে আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে একটি আদর্শ দেশ হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা দেখাই।
কিন্তু এই উল্লেখযোগ্য সামাজিক অর্জনগুলোর উৎস খতিয়ে দেখার প্রবণতা আমরা দেখাই না। এগুলো হঠাৎই আকাশ থেকে পড়েনি কিংবা এমনি এমনি আসেনি। এমনকি এগুলো স্রেফ প্রযুক্তিগত বা বৈজ্ঞানিক অর্জনও ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের আন্দোলনের এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর দেশটির প্রাণকেন্দ্রে নাগরিক অধিকার আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। আর কেবল ষাটের দশকের নাগরিক অধিকার আন্দোলনই নয়, ১৯৬০ সাল থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত বিভিন্ন দাবি, সংকট, ধারণা ও অধিকার আদায়ের ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্রে অসংখ্য আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল। সোলনিট তাঁর দীর্ঘ প্রবন্ধে তৎকালীন এমন কিছু বাস্তব আন্দোলনের চিত্র তুলে ধরেছেন, যা কেবল মানুষের রাজনৈতিক চেতনাকেই গড়ে তোলেনি, বরং যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে খোদ আন্দোলনের ধারণাকে নতুনভাবে রূপদান করেছিল।
সোলনিটের মূল বক্তব্যই ছিল ‘আশা’ নিয়ে, তবে তা কোনো অলীক স্বপ্ন বা অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা হিসেবে নয়, বরং আশা হলো অনুপ্রেরণার সেই যোগসূত্রের এক অনিবার্য ফসল, যা যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন মহাদেশ, দেশ ও প্রজন্মের চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে আসছে। আর একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে, একটি ঐতিহাসিক গণ–অভ্যুত্থানের দুই বছর পর পেছনে ফিরে তাকিয়ে আমার মনে হয়, আমরা এখনো সেই গৌরবময় অতীত থেকে পাওয়া অনুপ্রেরণার সূত্রগুলোকে বহন করে চলেছি।
আশার সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনাও জড়িত থাকে। কর্মপরিকল্পনাহীন আশা কোনো আশা নয়, তা কেবলই এক বিভ্রম। আর এই বিভ্রম মানুষকে হয় চরমপন্থার দিকে ঠেলে দেয়, না হয় তীব্র শূন্যতাবাদকে ডেকে আনে। প্রকৃত আশা গড়ে ওঠে সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য ও কার্যকর কর্মতৎপরতার ওপর ভিত্তি করে। প্রকৃত পরিবর্তনের লক্ষ্যে পরিচালিত আন্দোলন কখনো ব্যর্থ হয় না। সত্যিকারের সক্রিয়তা ও আশার জগতে ‘ব্যর্থতা’ কেবলই একটি অর্থহীন বা অকার্যক