জুলাই গণ–অভ্যুত্থান কোনো আকস্মিক বিস্ফোরণ ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বঞ্চনা, নির্বাচন নিয়ে আস্থাহীনতা, নাগরিকদের অধিকার হরণ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্নীতি ও শাসকদের বৈধতার সংকট ঘনীভূত হচ্ছিল। রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার সামাজিক চুক্তি দুর্বল হয়ে পড়ছিল। প্রতিনিধিত্বের সংকট, রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বিশেষত তরুণদের অনিশ্চয়তা ক্ষোভকে আরও গভীর করে তোলে। তারই ঐতিহাসিক বহিঃপ্রকাশ ঘটে জুলাইয়ে।

আন্দোলনের তাৎক্ষণিক উদ্দীপক ছিল একটি নির্দিষ্ট ইস্যু। কিন্তু রাষ্ট্রের কঠোর প্রতিক্রিয়া, বলপ্রয়োগ এবং সংলাপের পরিবর্তে দমননীতিই সীমিত প্রতিবাদকে জাতীয় অভ্যুত্থানের দিকে নিয়ে যায়। ভয় দেখিয়ে শাসনের পুরোনো চর্চা এখানেও জয়ী হতে চেয়েছিল। কিন্তু ঘটল উল্টো। জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় সামাজিক পরিবর্তন ছিল ভয়ের সংস্কৃতির ভাঙন। ব্যক্তিগত সাহস যখন সম্মিলিত সাহসে পরিণত হলো, তখন দীর্ঘস্থায়ী কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে গেল।

একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন আরও পড়ুন একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন

তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশ ছিল জুলাইয়ের অন্যতম ঐতিহাসিক অর্জন। তারা প্রমাণ করল, রাষ্ট্র কেবল শাসকের বিষয় নয়, নাগরিকের সক্রিয় অংশগ্রহণই রাষ্ট্রের প্রকৃত বনিয়াদ। শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিলেও নারী, শ্রমজীবী, মধ্যবিত্ত, পেশাজীবী, আলেম, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ আন্দোলনকে একটি সর্বজনীন গণ–আন্দোলনে পরিণত করে।

আন্দোলনের শক্তি ছিল এর বিকেন্দ্রিত নেতৃত্ব ও বিস্তৃত সামাজিক নেটওয়ার্কে। বহু ব্যক্তি, বহু উদ্যোগ এবং ডিজিটাল যোগাযোগের সমন্বয়ে আন্দোলন দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। তা দমন করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞাপন

জুলাই ছিল রাজনৈতিক প্রতিরোধ। কিন্তু তার গভীরে ছিল নৈতিক প্রবাহ। আন্দোলনের ভাষায় ছিল এর প্রতিফলন। প্রতিশোধের বদলে ন্যায়বিচার, আধিপত্যের বদলে মর্যাদা, আনুগত্যের বদলে নাগরিক অধিকার এবং ক্ষমতার বদলে জবাবদিহির ভাষা আন্দোলনের নৈতিক বৈধতা রচনা করে।

আন্দোলনটি ইতিহাস ও স্মৃতিকে নতুনভাবে এস্তেমাল করেছে। অতীতের গণ–আন্দোলন, শহীদদের স্মৃতি, জাতীয় প্রতীক ও সংগ্রামের ভাষাকে নতুন প্রজন্ম নিজেদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়েছে এবং পুনর্ব্যাখ্যা করেছে। ফলে ইতিহাস বর্তমানের সংগ্রামী শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আন্দোলনের সংগঠন, প্রচার ও জনমত গঠনে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। একই সঙ্গে তথ্যযুদ্ধ, গুজব, অপপ্রচার ও বর্ণনাগত প্রতিযোগিতাও আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রায় পরিণত হয়।

অভ্যুত্থানটি রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করে। সে স্পষ্ট করে, সরকার পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারও গণকল্যাণী রূপান্তরই অপরিহার্য শর্ত।

জুলাই বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, প্রবাসী বাংলাদেশি, মানবাধিকার সংস্থা এবং বৈশ্বিক কূটনৈতিক পরিসরেরও আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়। একই সঙ্গে ভূরাজনৈতিক স্বার্থ ও আঞ্চলিক শক্তির অবস্থানও জুলাইয়ের ওপর প্রভাব ফেলে।

এই আন্দোলনের চালিকা শক্তি ছিল বহুস্তর বাস্তবতা। এক দিকে ছিল স্বৈরশাসনের পতনের দাবি; অপর দিকে ছিল অপমানবোধ, ক্ষোভ, শোক, আশা, আত্মমর্যাদা ও সম্মিলিত সাহসের মতো গভীর সামাজিক আবেগ। আধিপত্যবাদের বহুমুখী আগ্রাসনের বিপরীতে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতি জনতার প্রগাঢ় অঙ্গীকারও এতে যুক্ত থেকেছে।

এই আন্দোলনে সবাই একইভাবে অংশ নেয়নি। সবার অভিজ্ঞতাও এক ছিল না। অঞ্চল, শ্রেণি, শিক্ষা, পেশা ও সামাজিক অবস্থানভেদে মানুষের অংশগ্রহণ ও অভিজ্ঞতা ছিল আলাদা। ফলে জুলাইকে একরঙা ছবি হিসেবে দেখলে বাস্তবতার অনেক স্তর গায়েব হয়ে যায়। এর শক্তি ছিল বহুমাত্রিক, সীমাবদ্ধতাও ছিল বহুমাত্রিক।

যেকোনো অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় ভুল–বোঝাবুঝি হলো ক্ষমতার পরিবর্তনকেই ইতিহাসের পরিবর্তন মনে করা। অথচ ইতিহাসের গভীরতম পরিবর্তন ঘটে তখন, যখন একটি সমাজ তার চিন্তার ধরন, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নৈতিক মানদণ্ড এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর চরিত্র বদলে ফেলতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে জুলাই গণ–অভ্যুত্থান একটি যুগান্তকারী সূচনা হলেও তার সামনে এখনো অনেক অসমাপ্ত কাজ রয়ে গেছে। জুলাই রাষ্ট্রক্ষমতার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী সামাজিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, কিন্তু রাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন ও সুসংহত একটি দর্শন এখনো নির্মাণ করতে পারেনি। রাষ্ট্র কেমন হবে, ক্ষমতার সীমা কতটুকু, নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য কীভাবে ভারসাম্যে থাকবে, প্রতিষ্ঠান কীভাবে ব্যক্তির ঊর্ধ্বে অবস্থান করবে—এসব মৌলিক প্রশ্নের উত্তর এখনো একটি সমন্বিত আকার পায়নি। একই সঙ্গে যথাযথ প্রক্রিয়ায় খুনিদের বিচার নিশ্চিত করা, পুনর্মিলন ও জবাবদিহির মধ্যে কী ধরনের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে, সে প্রশ্নও এখনো সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়নি।

এই তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রশ্ন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্য গড়ে তোলা তুলনামূলক সহজ; কিন্তু ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের নকশা তৈরি করা অনেক কঠিন। জুলাই পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে প্রশ্ন করেছে, কিন্তু নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। আমাদের রাজনৈতিক ঐতিহ্যে ব্যক্তি প্রায়ই প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, আনুগত্য যুক্তির চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। প্রতিপক্ষকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয় এখানে। যদি এই সংস্কৃতি বহাল থাকে, তাহলে নতুন মানুষ ক্ষমতায় এলেও পুরোনো রাজনীতির ছায়ায় আপনি আছেন। পুরোনো সংস্কৃতিতে দাঁড়িয়ে নতুন রাজনীতি নির্মাণ করা যায় না।

জুলাই একটি প্রবল নৈতিক শক্তি সৃষ্টি করেছিল, কিন্তু তাকে টেকসই সামাজিক নৈতিকতায় রূপ দেওয়া যায়নি। আন্দোলনের মুহূর্তে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে একত্র হয়; কিন্তু আন্দোলনের পরে একই মানুষ যদি আইনকে সম্মান না করে, দুর্নীতিকে প্রত্যাখ্যান না করে, ভিন্নমত সহ্য না করে এবং নিজের সুবিধার জন্য নীতি বিসর্জন দেয়, তবে আন্দোলনের নৈতিক শক্তি ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যায়। একটি জাতির চরিত্র মিছিলে যতটা গড়ে ওঠে, তার চেয়ে অ