ডিটারের ছোট্ট ফ্ল্যাটে তিন দিন—

ডিটারের ফ্ল্যাট ছিল হুমবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব কাছেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ভবনগুলোর পাশে তার ছোট্ট বাসাটি ছিল সাধারণ, কিন্তু আন্তরিকতায় ভরা। সেই তিন দিন আমি পর্যটক নয়, বরং বন্ধুর ঘরের অতিথি হয়ে পূর্ব বার্লিনকে দেখেছিলাম। সকালে আমরা বেরিয়ে পড়তাম শহর ঘুরতে। মেট্রোরেল-উ-বান (U-Bahn), ট্রাম এবং হাঁটতে হাঁটতে দেখেছি বার্লিনের নানা ঐতিহাসিক স্থান।

বিশ্বকাপ দেখতে আসা বাংলাদেশিদের ২২% কানাডায় অ্যাসাইলাম চেয়েছেন এখন পর্যন্ত আরও পড়ুন বিশ্বকাপ দেখতে আসা বাংলাদেশিদের ২২% কানাডায় অ্যাসাইলাম চেয়েছেন এখন পর্যন্ত

আলেকজান্ডার প্লাৎসের ব্যস্ততা, বার্লিন টেলিভিশন টাওয়ারের আকাশছোঁয়া অবয়ব, বার্লিন ক্যাথেড্রালের মহিমা—সবকিছুই আমাকে মুগ্ধ করেছিল। ডিটার শুধু স্থান দেখাত না, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গল্পও বলত। একটি শহরকে সত্যিকার অর্থে জানতে হলে তার রাস্তা দেখা যথেষ্ট নয়; জানতে হয় তার মানুষের স্মৃতিও। মিউজিয়াম আইল্যান্ড ছিল আমাদের অন্যতম গন্তব্য। সেখানে প্রবেশ করে মনে হয়েছিল, পৃথিবীর হাজার বছরের সভ্যতা যেন একই ছাদের নিচে এসে মিলিত হয়েছে। পেরগামন জাদুঘরের গ্রিক স্থাপত্য, প্রাচীন মিসরের নিদর্শন, ইসলামী শিল্পকলার সংগ্রহ—সবকিছু আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল।

আমি প্রাণিবিদ্যার ছাত্র ছিলাম, তাই শুধু মানুষের ইতিহাস নয়, জীবনের বৈচিত্র্যও আমাকে সব সময় আকর্ষণ করত। জাদুঘরের প্রতিটি নিদর্শন দেখে মনে হচ্ছিল, মানুষও এক দীর্ঘ বিবর্তনের গল্পের অংশ, যে গল্পে সভ্যতা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানের ধারাবাহিকতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়ে এসেছে। ডিটার না থাকলে হয়তো এ শহরকে এত গভীরভাবে দেখা সম্ভব হতো না। সে ছিল আমার গাইড, বন্ধু এবং এক অর্থে ইতিহাসের জীবন্ত ব্যাখ্যাকার। কিন্তু পূর্ব বার্লিনের শান্ত দিনগুলোতেও আমার মনে একটি প্রশ্ন বারবার ঘুরছিল—একই শহর, একই মানুষ, একই ইতিহাস; তবু কেন একটি অদৃশ্য দেয়াল তাদের আলাদা করে রেখেছে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই কয়েক দিন পর আমি একা পাড়ি দিলাম পশ্চিম বার্লিনের পথে।

বিজ্ঞাপন

চেকপয়েন্ট চার্লি পেরিয়ে অন্য এক পৃথিবীতে

পূর্ব বার্লিনে কয়েক দিন কাটানোর পর একদিন সিদ্ধান্ত নিলাম পশ্চিম বার্লিনে যাব। এই যাত্রা আমার জন্য শুধু একটি শহর থেকে আরেকটি শহরে যাওয়া ছিল না; এটি ছিল একই নগরীর দুই ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া। কিন্তু ডিটার আমার সঙ্গে যেতে পারল না। পূর্ব জার্মানির নাগরিক হিসেবে তার জন্য পশ্চিম বার্লিনে প্রবেশ করা ছিল প্রায় অসম্ভব। যে শহর তার নিজের দেশেই অবস্থিত, সেই শহরের একটি অংশে যাওয়ার অধিকারও তার ছিল না। এ অদ্ভুত বাস্তবতা তখন আমার কাছে যতটা বিস্ময়কর মনে হয়েছিল, আজ এত বছর পর ভাবলেও ততটাই বেদনাদায়ক মনে হয়। বিদায় নেওয়ার সময় ডিটার শুধু মৃদু হেসে বলেছিল, ‘তুমি দেখে এসো। ফিরে এসে আমাকে সব বলবে।’ তার সেই হাসির মধ্যে ছিল বন্ধুত্ব, কৌতূহল এবং কোথাও যেন এক অদৃশ্য সীমাবদ্ধতার বেদনা।

আমার কাছে পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির উভয় অংশের ভিসা ছিল। নির্ধারিত দিনে আমি ট্রেনে উঠলাম পশ্চিম বার্লিনের উদ্দেশ্যে। মাত্র ২০ মিনিটের পথ। কিন্তু যতই সীমান্তের কাছাকাছি আসছিলাম, পরিবেশ ততই বদলে যাচ্ছিল। ট্রেন থামল। সশস্ত্র সীমান্তরক্ষীরা উঠে এল। তাদের সঙ্গে ছিল প্রশিক্ষিত কুকুর। প্রতিটি বগি, প্রতিটি যাত্রী, প্রতিটি লাগেজ সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করা হলো। বাতাসে ছিল একধরনের অস্বস্তিকর নীরবতা। মনে হচ্ছিল, একটি শহরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছি না; বরং দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যবর্তী এক অদৃশ্য প্রাচীর অতিক্রম করছি।

অবশেষে পৌঁছালাম চেকপয়েন্ট চার্লিতে। শীতল যুদ্ধের ইতিহাসে এই নাম যেন কিংবদন্তির মতো। পূর্ব ও পশ্চিম বার্লিনের সীমান্তে অবস্থিত এই চেকপয়েন্ট ছিল বিদেশি নাগরিক, কূটনীতিক ও বিশেষ অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত প্রবেশপথ। সীমান্ত কর্মকর্তার হাতে আমার পাসপোর্ট গেল। তিনি দীর্ঘক্ষণ সেটা পরীক্ষা করলেন। তারপর একটি ভারী ধাতব সিল দিয়ে পাসপোর্টে প্রবেশের অনুমতি চিহ্নিত করলেন। সেই ছোট্ট সিল তখন হয়তো কেবল একটি প্রশাসনিক চিহ্ন ছিল, কিন্তু আজও সেটি আমার কাছে ইতিহাসের একটি স্পর্শযোগ্য স্মৃতি। কারণ, সেই সিল আমাকে প্রবেশাধিকার দিয়েছিল এমন এক শহরের অংশে, যেখানে একই সময়ে স্বাধীনতা ও বিভাজন পাশাপাশি অবস্থান করছিল।

পশ্চিম বার্লিন: স্বাধীনতার দ্বীপ

বিভক্ত জার্মানির মানচিত্রে পশ্চিম বার্লিন ছিল এক অদ্ভুত বাস্তবতার শহর। চারদিকে পূর্ব জার্মানির ভূখণ্ডে ঘেরা, অথচ রাজনৈতিকভাবে পশ্চিমা বিশ্বের অংশ। যেন এক বিশাল প্রাচীরের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা স্বাধীনতার ছোট্ট এক দ্বীপ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসা এ শহর ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিল গণতন্ত্র, সংস্কৃতি ও আধুনিকতার প্রতীক।

চেকপয়েন্ট চার্লি পেরিয়ে পশ্চিম বার্লিনে প্রবেশ করতেই যেন এক ভিন্ন পরিবেশ অনুভব করলাম। রাস্তার দৃশ্য বদলে গেল। দোকানের জানালায় রঙিন বিজ্ঞাপন, ব্যস্ত পথচারী, আধুনিক গাড়ি, নিয়ন আলোর ঝলকানিসহ সবকিছুতেই ছিল একধরনের উন্মুক্ততা ও গতি। পূর্ব বার্লিনের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের সঙ্গে এর পার্থক্য ছিল স্পষ্ট। তখন বুঝলাম, রাজনৈতিক ব্যবস্থা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কত গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

তবে পশ্চিম বার্লিনেও যুদ্ধের স্মৃতি মুছে যায়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল কাইজার ভিলহেল্ম মেমোরিয়াল চার্চ। যুদ্ধের বোমায় ক্ষতিগ্রস্ত এ গির্জাকে ইচ্ছাকৃতভাবে সম্পূর্ণ পুনর্নির্মাণ করা হয়নি। ধ্বংসপ্রাপ্ত মিনারটি রাখা হয়েছিল স্মৃতির প্রতীক হিসেবে যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যুদ্ধের ভয়াবহতা ভুলে না যায়। ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও যে শান্তির আহ্বান থাকতে পারে, এ গির্জা তারই অসাধারণ উদাহরণ। পশ্চিম বার্লিনের একটি বিখ্যাত ডিপার্টমেন্ট স্টোর (KaDeWe) থেকে কিছু স্যুভেনির কিনে নিলাম এবং দুটি টি-শার্ট, একটি আমার জন্য ও আরেকটি ডিটারের জন্য। ডিপার্টমেন্ট স্টোরটি ছিল চোখে পড়ার মতো।

আজকের ঐক্যবদ্ধ বার্লিনের প্রাণচাঞ্চল্যের পেছনে সেই পশ্চিম বার্লিনের সংগ্রামের ইতিহাস লুকিয়ে আছে। ব্রান্ডেনবুর্গ গেট, রাইখস্টাগ কিংবা বার্লিন প্রাচীরের অবশিষ্টাংশের সামনে দাঁড়ালে তাই শুধু স্থাপত্য দেখা হয়