চট্টগ্রাম মহানগর ও সাত জেলায় পুলিশের তালিকায় ১০৯ জন; এর বাইরে রয়েছে অন্তত ১৩৯ অস্ত্রধারী।
চট্টগ্রামে জুলাই আন্দোলনে অস্ত্র নিয়ে আক্রমণকারী ৪৬ জনের কারও নাম ‘শুটার’ তালিকায় নেই।
আরও পড়ুন
একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন
ফেনীর তালিকায় অস্ত্রধারী মাত্র ৫ জন। অনুসন্ধানে আরও অন্তত ৩৩ জনের তথ্য পাওয়া গেছে।
চুরি-ছিনতাই দিয়ে অপরাধজগতে ঢোকা শহীদুল ইসলাম পরে মাদক কারবারে জড়িয়ে গড়ে তোলেন নিজস্ব বাহিনী। একসময় ‘কিশোর গ্যাং’ নেতা হিসেবে পরিচিত এই শহীদুল এখন চট্টগ্রামের আলোচিত অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের একজন। অস্ত্র, চাঁদাবাজি, মাদকসহ বিভিন্ন অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে ২৩টি মামলা রয়েছে।
পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) করা চট্টগ্রাম মহানগরের ‘শুটার’ তালিকায় শহীদুলের নাম আছে। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শহীদুলের মতো বাহিনী পরিচালনা, প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া ও গুলি চালানোর অভিযোগ থাকা অনেকের নামই নেই পুলিশের তালিকায়।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে চট্টগ্রাম মহানগর ও বিভাগের সাত জেলায় (পার্বত্য তিন জেলা ও কক্সবাজার ছাড়া) পুলিশের তালিকার বাইরে অন্তত ১৩৯ জন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কেবল চট্টগ্রাম মহানগরেই তালিকার বাইরে রয়েছে অন্তত ৮৫ জন। অথচ পুলিশের তালিকায় মহানগরে ‘শুটার’ হিসেবে নাম আছে মাত্র ৯ জনের।
চট্টগ্রাম মহানগর ও বিভাগের সাত জেলায় পুলিশের তালিকায় মোট ১০৯ জনের নাম রয়েছে। অর্থাৎ পুলিশের তালিকায় যতজনের নাম আছে, অনুসন্ধানে তার চেয়েও বেশি অস্ত্রধারীর তথ্য মিলেছে, যারা তালিকার বাইরে। এতে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের এই তালিকার পূর্ণতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশের তালিকায় থাকা শহীদুল ইসলাম ভোলার দৌলতখানের বাসিন্দা। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র বলছে, চট্টগ্রাম নগরের পশ্চিম ষোলশহর এলাকায় অবস্থান করে তিনি বাহিনী পরিচালনা করতেন। চাঁদাবাজি, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণ, টর্চার সেল পরিচালনা ও মাদক কারবারের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। গত বছরের ২১ ডিসেম্বর র্যাব তাঁকে গ্রেপ্তার করে। বর্তমানে তিনি কারাগারে থাকলেও তাঁর বাহিনী নগরের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা।
এসবির উদ্যোগে গত ফেব্রুয়ারিতে সারা দেশের ‘শুটারদের’ একটি তালিকা করা হয়। সেখানে মোট ২৪৩ জনের নাম, মামলা, তাঁরা কারাগারে নাকি জামিনে রয়েছেন—এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগর ও সাত জেলার ১০৯ জনের নাম রয়েছে। হত্যা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখতে শুটারদের গ্রেপ্তারের লক্ষ্যেই পুলিশ এই তালিকা করে।
তালিকায় চট্টগ্রাম মহানগরের শুটার হিসেবে ৯ জনের নাম রয়েছে। তাঁরা হলেন মোবারক হোসেন ওরফে ইমন, মো. রায়হান, মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিন, বাদশা ওরফে ছোট বাদশা, মো. আলাউদ্দিন, মো. হেলাল ওরফে মাছ হেলাল, মো. নজরুল ইসলাম সোহেল, শহীদুল ইসলাম ও নুরে আলম সোহাগ। এর মধ্যে বোরহান উদ্দিন ও নজরুল ইসলাম জামিনে মুক্তি পেয়ে এখন পলাতক। বাকিদের কেউ কারাগারে, কেউ প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
এই ৯ জনের বাইরে কেবল চট্টগ্রাম মহানগরেই আরও ৮৫ জন অস্ত্রধারী ‘সন্ত্রাসীর’ তথ্য পাওয়া গেছে, যাদের নাম তালিকায় আসেনি।
এর বাইরে চট্টগ্রাম বিভাগের সাত জেলায় (পার্বত্য তিন জেলা ও কক্সবাজার বাদে) পুলিশের তালিকায় শুটার রয়েছে ১০০ জন। সবচেয়ে বেশি ৩৩ জনের নাম রয়েছে নোয়াখালী জেলায়। তবে তালিকার বাইরে আরও অন্তত ৫ জন অস্ত্রধারীর নাম পাওয়া গেছে।
প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন, গুলিবর্ষণের ঘটনার ছবি ও ভিডিও গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ব্যাপকভাবে প্রকাশ পাওয়ার পর আলোচনায় ছিল ফেনী। কিন্তু পুলিশের তালিকায় ফেনী জেলায় অস্ত্রধারী ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে নাম রয়েছে কেবল ৫ জনের। আরও ৩৩ জনের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে, যাঁদের অনেকে অস্ত্রধারী হিসেবে এলাকায় বহুল পরিচিত; কিন্তু তাঁদের নামও পুলিশের তালিকায় আসেনি।
একইভাবে চট্টগ্রাম জেলায় অন্তত ১১ জনের নামও তালিকার বাইরে রয়ে গেছে। কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়ও এমন কয়েকজনের নাম বাদ গেছে।
পুলিশের প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব অস্ত্রধারী ‘সন্ত্রাসীদের’ অনেকেই বছরের পর বছর ধরে চট্টগ্রাম শহরসহ এই বিভাগের বিভিন্ন জেলায় সক্রিয় রয়েছে। তারা খুন, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ নানা অপরাধে জড়িত। পেশাদার অপরাধীর বাইরে অস্ত্রধারীদের কেউ কেউ বিএনপির ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কোনো কোনো অস্ত্রধারীকে এনসিপির নেতা-কর্মীদের সঙ্গেও দেখা গেছে, যাঁরা একসময় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অভ্যুত্থানের পর যখন দেশের আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছিল, তখন থেকেই চট্টগ্রামের পেশাদার অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
চট্টগ্রামের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে, তা পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট। পুলিশ সদর দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মহানগরীসহ বিভাগের ১১ জেলায় চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৩৯০টি খুনের মামলা হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরীতে ২৭টি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চাঁদাবাজি, জায়গাজমি নিয়ে বিরোধ, পারিবারিক কলহ, মাদক বিক্রি, আধিপত্য বিস্তার, গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব, পূর্বশত্রুতা, কিশোর গ্যাংয়ের বিরোধ ও রাজনৈতিক বিরোধে এসব খুনের ঘটনা ঘটেছে।
শুধু চট্টগ্রাম জেলায় জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ২৯টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রাম পুলিশের একটি সূত্র বলছে, জানুয়ারি মাসের ২৬ দিনেই ১২টি খুন হয়। সর্বশেষ ৮ মে রাতে নগরের বায়েজিদ বোস্তামী রৌফাবাদ এলাকায় পাঁচ-ছয়জন অস্ত্রধারী হাসান রাজু নামের একজনকে প্রকাশ্যে গুলি করে পালিয়ে যায়। হাসান এর আগে গত ২৬ এপ্রিল রাউজানে যুবদল কর্মী নাসির উদ্দিন হত্যা মামলার আসামি ছিলেন। পুলিশ বলছে, পূর্ববিরোধের জেরে খুনের প্রতিশোধ নিতে এই খুনের ঘটনা ঘটতে পারে।
চট্টগ্রামের কয়েকজন ব্যবসায়ী প্রথম আলোকে বলেন, চট্টগ্রামে কারা অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, কারা চাঁদার জন্য ব্যবসায়ীদের বাড়িতে গিয়ে গুলি করে, হুমকি দেয়—সেটা পুলিশের অজানা নয়। কিন্তু অস্ত্রধ