ভারতের পাঞ্জাবে ১৯৮০ ও ১৯৯০–এর দশকের শুরুর দিকে শিখদের আন্দোলনকে ভিত্তি করে নির্মিত একটি চলচ্চিত্র নিয়ে বিতর্ক চলছে। চলচ্চিত্রটি দর্শকদের জন্য উপযুক্ত কি না, তা নিয়ে এখন তদন্ত করছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ।

‘সাতলুজ’ নামের এই চলচ্চিত্রের নামকরণ করা হয়েছে পাঞ্জাবের একটি নদীর নামে। নির্মাতাদের দাবি, এটি মানবাধিকারকর্মী যশবন্ত সিং খালরার সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত। খালরা পাঞ্জাবে বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনে সরকারি অভিযানের সময় হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ হওয়া এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ তদন্ত করেছিলেন। অভিযোগ আছে, ১৯৯৫ সালে পুলিশ তাঁকে আটক করার পর নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করেছে।

শিল্প, জলবায়ু ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তিকে একসূত্রে আনল ‘দ্য তত্ত্বমসি সার্কেল’ আরও পড়ুন শিল্প, জলবায়ু ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তিকে একসূত্রে আনল ‘দ্য তত্ত্বমসি সার্কেল’

চলচ্চিত্রটির মূল নাম ছিল ‘পাঞ্জাব নাইনটি ফাইভ’। ভারতের সেন্সর বোর্ড তিন বছর ধরে সিনেমাটির মুক্তি আটকে রাখে। পরে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির অনুমতি দিলেও সিনেমার নাম পরিবর্তন এবং প্রায় ১৩০টি দৃশ্য বা অংশে কাটছাঁট করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

তবে নির্মাতারা সেই কাটছাঁট মানতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর ৩ জুলাই তাঁরা জিফাইভ স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে ‘সাতলুজ’ নামে ছবিটি মুক্তি দেন। কিন্তু নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে মুক্তির মাত্র ৪৮ ঘণ্টা পরই প্ল্যাটফর্মটি থেকে সিনেমাটি সরিয়ে ফেলা হয়।

বিজ্ঞাপন

‘সাতলুজ’ নিয়ে এত বিতর্কের কারণ কী, তা জেনে নেওয়া যাক।

‘সাতলুজ’ চলচ্চিত্রটি কী নিয়ে তৈরি

১৬৩ মিনিটের এই জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক হানি ত্রেহান। এটি মানবাধিকারকর্মী যশবন্ত সিং খালরার জীবন এবং তাঁর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত।

চলচ্চিত্রে দেখা যায়, পাঞ্জাবের অমৃতসরের ব্যাংককর্মী খালরা প্রথমে তাঁর এক বন্ধু ও বন্ধুর মায়ের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় কারণ অনুসন্ধান করতে শুরু করেন। আর তা করতে গিয়ে তিনি একই ধরনের হাজারো নিখোঁজের ঘটনার সন্ধান পান।

পাঞ্জাবে শিখদের জন্য খালিস্তান নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে চলা আন্দোলন দমন করতে গিয়ে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর চালানো অভিযানে এই নিখোঁজ এবং কথিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল।

খালরার তদন্তে অভিযোগ করা হয়, পুলিশ প্রায় ২৫ হাজার নিখোঁজ ব্যক্তির মরদেহ গোপনে দাহ করেছে। এ ক্ষেত্রে মৃতদের পরিবারের সদস্যদের কিছু জানানো হয়নি এবং এ–সংক্রান্ত কোনো সরকারি নথিও সংরক্ষণ করা হয়নি।

হুমকি উপেক্ষা করে যশবন্ত সিং খালরা তাঁর তথ্যানুসন্ধান চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর অমৃতসরে নিজের বাড়ির সামনে থেকে তাঁকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। এরপর খালরাকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও তাঁর মরদেহ আজও উদ্ধার হয়নি। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল ৪২ বছর।

নিরাপত্তা হেফাজতে খালরার মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী পরমজিৎ ন্যায়বিচারের দাবিতে আন্দোলন চালান। এর পরিপ্রেক্ষিতে ভারত সরকার অভিযোগগুলো তদন্তের দায়িত্ব কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোকে (সিবিআই) দেয়। খালরা হত্যাকাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত পাঁচজন পুলিশ কর্মকর্তা বর্তমানে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন।

চলচ্চিত্রে খালরার চরিত্রে অভিনয় করেছেন ভারতের জনপ্রিয় অভিনেতা দিলজিৎ দোসাঞ্জ। চলচ্চিত্রটিতে কাহিনি বর্ণনা করেছেন সিবিআই তদন্তে নেতৃত্বদানকারী পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্রে অভিনয় করা অভিনেতা।

মুক্তির পর চলচ্চিত্রটি সমালোচকদের ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। অনেকেই এটিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে নির্মিত সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী চলচ্চিত্রগুলোর একটি বলে উল্লেখ করেছেন।

খালিস্তান আন্দোলন কী, পাঞ্জাবে কী ঘটেছিল

১৯৮০-এর দশক ও ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে খালিস্তান আন্দোলন ছিল স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অভ্যন্তরীণ সংঘাতগুলোর একটি।

শিখদের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র ‘খালিস্তান’ প্রতিষ্ঠার দাবিতে গড়ে ওঠা এই আন্দোলনের পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অসন্তোষ। এর মধ্যে শিখ পরিচয়ের স্বীকৃতি, পাঞ্জাবের জন্য বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনের দাবি, প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর সঙ্গে নদীর পানিবণ্টন নিয়ে বিরোধ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ ছিল অন্যতম।

এই আন্দোলনের সময় সশস্ত্র শিখ যোদ্ধারা বোমা হামলা, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হত্যার মতো হামলা চালান। জবাবে ভারতীয় পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী আন্দোলন দমনে ব্যাপক অভিযান শুরু করে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, ওই অভিযানে নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নিরাপত্তা হেফাজতে হত্যাকাণ্ড, জোরপূর্বক গুম এবং গোপনে মরদেহ দাহ করার মতো ঘটনা ঘটেছিল।

১৯৮৪ সালের জুনে ভারতীয় সেনাবাহিনী অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে অভিযান চালায়। সে সময় শিখদের সবচেয়ে পবিত্র এই উপাসনালয়টি খালিস্তান আন্দোলনের কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ‘অপারেশন ব্লু স্টার’ নামে পরিচিত ওই অভিযানে শত শত মানুষ নিহত হন।

একই বছরের অক্টোবরে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁর দুই শিখ দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হন। স্বর্ণমন্দিরে রক্তপাতের জন্য ইন্দিরাকে দায়ী করে তাঁরা এই হত্যাকাণ্ড ঘটান। এর পরপরই পাঞ্জাব ও রাজধানী নয়াদিল্লিতে ভয়াবহ শিখবিরোধী সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এতে হাজার হাজার শিখ নিহত হন। শিখ সংগঠনগুলো এই সহিংসতাকে গণহত্যা হিসেবে উল্লেখ করেছে।

এর প্রতিশোধ হিসেবে ১৯৮৬ সালে শিখ যোদ্ধারা জেনারেল অরুণ কুমার বৈদ্যকে হত্যা করেন। স্বর্ণমন্দিরে অভিযানের সময় তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন। এ ছাড়া ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে শিখবিরোধী সহিংসতার জন্য দায়ী বলে মনে করা কয়েকজন সংসদ সদস্যকেও হত্যা করা হয়।

১৯৯৪ সালে পাঞ্জাবের তৎকালীন গভর্নর সুরেন্দর নাথ নিহত হন। পরের বছর ১৯৯৫ সালে আত্মঘাতী হামলায় নিহত হন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী বিয়ান্ত সিং।

১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ের পর পাঞ্জাবে সহিংসতা অনেকটাই কমে আসে। তবে ভারত এখনো দেশ-বিদেশের কয়েকটি শিখ সংগঠনের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে থাকে।

কে ছিলেন যশবন্ত সিং খালরা

১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে পাঞ্জাবের সহিংসতা ও অস্থিরতার সময়ে মানবাধিকারকর্মী যশবন্ত সিং খালরার গল্পটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

ওই সময় খালরা পৌরসভার শ্মশানের নথিপত্র খতিয়ে দেখে অভিযোগ করেন, পুলিশ হাজার হা