গত শতাব্দীর শুরুর দিকে সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘বিলাসী’ গল্পে লিখেছিলেন—‘অতিকায় হস্তী লোপ পাইয়াছে, কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া আছে।’
প্রায় এক শ বছর পর এই বাক্য দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন করে ফিরে এসেছে। ভারতের রাজধানী দিল্লির রাজপথে আজ হাজার হাজার তরুণ ‘তেলাপোকা’ হয়ে উঠেছে। ক্ষমতার বিশাল ‘হস্তী’কেও চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তাঁরা দিল্লির রাজপথে নামছেন।
আরও পড়ুন
একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন
আর বাংলাদেশের জন্য এই আন্দোলন থেকে নেওয়ার মতো অনেক শিক্ষা আছে, যা আমাদের সমাজ ও রাজনীতির নীতিনির্ধারকদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলতে পারে।
কিন্তু এই তেলাপোকা আসলে কতটা শক্তিশালী, তা জানতে গেলে বিজ্ঞানের দিকে তাকাতে হবে। শরৎচন্দ্র যে তেলাপোকার কথা লিখেছিলেন, তিনি হয়তো জানতেন না যে এই পোকা আসলে কতটা অসম্ভব শক্তিশালী।
২০১৮ সালে ‘নেচার কমিউনিকেশন’-এ চীনা গবেষকদের একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তাঁরা দেখেন, তেলাপোকার জিনের সংখ্যা প্রায় ১৩ হাজার ৫০০, যা ঘাসফড়িংয়ের চেয়ে দেড় গুণ বেশি। শুধু তাই নয়, তেলাপোকার পেটে কিছু বিশেষ অণুজীব থাকে, যার কারণে তারা পচা-বাসি খাবারও সহজে হজম করতে পারে।
আরও আশ্চর্যের বিষয়, তারা নিজের পা হারিয়ে ফেললেও দ্রুত নতুন পা গজাতে পারে। খাবার যত বেশি পাওয়া যায়, পা গজানোর কাজটি তত দ্রুত হয়! এই বৈজ্ঞানিক সত্য রাজনীতিতে এসে দাঁড়িয়েছে এক ভিন্ন অর্থে। যারা অবহেলিত, যাদের অপমান করা হয়, তারাই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে—এটাই হয়তো ইতিহাসের পাঠ।
এই ঐতিহাসিক উক্তি যেন বাস্তবে প্রমাণ করতে ২০২৬ সালের ১৬ মে দিল্লিতে যা ঘটল, তা সত্যিই চমকপ্রদ। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত একদল বেকার তরুণকে ‘তেলাপোকা’ ও ‘সমাজের পরজীবী’ বলে মন্তব্য করেন।
এই অপমানের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ভারতীয় শিক্ষার্থী অভিজিৎ দীপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গঠন করেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। নামটি ছিল ক্ষমতাসীন দল বিজেপির প্যারোডি।
মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে এর অনুসারী ৩৫ লাখ ছাড়িয়ে যায়। ইনস্টাগ্রামে অনুসারী হয় ২ কোটি ২০ লাখের বেশি, যা বিজেপির অনুসারীর প্রায় দ্বিগুণ। অনলাইন থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দ্রুত রাজপথে ছড়িয়ে পড়ে।
আন্দোলনের মূল দাবি ছিল শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করা, কারণ নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা এবং শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক অনিয়ম। ২০ জুলাই সংসদ অভিমুখে মিছিলে পুলিশ লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়লে আহত হয় ১৮০ জন। কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী ও তাঁর বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রকেও পুলিশ আটক করলেও আন্দোলন থামেনি। বিক্ষোভকারীরা তাদের মাথায় তেলাপোকার মূর্তি ধারণ করে স্লোগান দিচ্ছে—‘আমরা তেলাপোকা, আমরা থাকব, আমরা জিতব!’
এখন এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রশ্নপত্র ফাঁস এখানে নতুন কোনো বিষয় নয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ২০১৫ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র চার বছরে (২০১১–২০১৪) ৬৩টি পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে (প্রশ্নপত্রের ভুল কি কেবল পূর্ণ নম্বরেই শেষ, দৈনিক প্রথম আলো ১৮ জুলাই , ২০২৬)।
২০০৪ সালে ২৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষা বাতিল হয়েছিল প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে। এরপর ২৫তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষাসহ অসংখ্য চাকরির পরীক্ষা, মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে।পাবলিক সার্ভিস কমিশনের ড্রাইভার আবেদ আলীকে জেলে পাঠিয়েই প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রধান কারিগর পাওয়া গেছে বলে রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিরা ঢেকুর তুলেছেন। বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁস, বারবার প্রতিশ্রুতি, কিন্তু স্থায়ী সমাধান নেই।
এই পুনরাবৃত্ত ইতিহাসই তৈরি করে তরুণদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ। অথচ প্রশ্নপত্র ফাঁসকে অনেক সময় ‘মামুলি বিষয়’ হিসেবেই দেখা হয়েছে। কিন্তু এই ‘মামুলি’ বিষয়ই একদিন প্রকট আকার ধারণ করতে পারে, যেমনটি দিল্লিতে হচ্ছে। সুতরাং, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সমস্যার স্থায়ী সমাধান জরুরি, নইলে এই চক্র ভাঙা সম্ভব নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভাষার রাজনীতি। একটি অসতর্ক শব্দই যথেষ্ট আগুন জ্বালানোর জন্য। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ বলে মন্তব্য করেন। এই একটি শব্দই আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
আন্দোলন এতটাই তীব্র হয় যে শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। একই ধরনের মানুষের ক্ষোভ দেখা গেল ভারতের ককরোচ আন্দোলনে। প্রধান বিচারপতির ‘তেলাপোকা’ শব্দটি তরুণদের মধ্যে এমন ক্ষোভের সঞ্চার করে যে তা রাতারাতি এক বিশাল আন্দোলনে রূপ নেয়। আর বাংলাদেশেও সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন এইচএসসি শিক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ বা ‘ব্রয়লার চিকেন’ বলে ব্যঙ্গ করেছিলেন।
শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং বৃষ্টি উপেক্ষা করেও দুই দিন রাজপথে অবস্থান নেয়। অবশেষে শিক্ষামন্ত্রী জাতীয় সংসদে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং সরকার কিছু দাবি মেনে নেয়। এই ঘটনাগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, রাজনীতিবিদদের ভাষা সম্পর্কে সতর্ক হতে হবে। একটি অসাবধান শব্দই আন্দোলনের সূচনা করতে পারে—বাংলাদেশে ‘রাজাকার’, ভারতে ‘তেলাপোকা’—উভয় ক্ষেত্রেই তা প্রমাণিত।
শুধু ভারত বা বাংলাদেশ নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণ-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের ঢেউ বইছে। শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকটে তরুণদের আন্দোলনে সরকারের পতন ঘটে। নেপালেও একই ধরনের যুব আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই আন্দোলনগুলো একসূত্রে গাঁথা—রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি গভীর হতাশা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, আর শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সংকট। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা—সব দেশেই তরুণেরা একই ভাষায় কথা বলছে, শুধু প্রেক্ষাপট ভিন্ন।
জনগণের অভিযোগ যখন শোনা হয় না, যখন সাধারণ কথাও অস্বাভাবিক করে তোলা হয়, তখন তরুণেরা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের আশ্রয় নেয়। সংগঠিত রাজনীতি যখন দুর্বল হয়, তখন মানুষ মিম, স্লোগান আর প্রতীকের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানায়। অন্ধকার সময়ে হাসতে পারাটাই হয়তো সাহসের শেষ রূপ।
তাই বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের উচিত দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তরুণদের ক্ষোভকে গুর