মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় পৌনে দুই বছর আগেই রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়লেন মো. সাহাবুদ্দিন। অসুস্থতাকে পদত্যাগের কারণ হিসেবে দেখালেও তাঁর এই বিদায় ঘটল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর শুরু হওয়া দীর্ঘ বিতর্কের পটভূমিতে।
শুক্রবার বিকেলে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র পাঠান মো. সাহাবুদ্দিন। পদত্যাগপত্র হাতে পাওয়ার পর সংসদ ভবনের শপথকক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে বিষয়টি জানান স্পিকার। একই সঙ্গে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের কথাও ঘোষণা করেন স্পিকার।
আরও পড়ুন
একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন
আগামী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। এই সময়ে স্পিকারের কার্যাবলি পালন করবেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। সে হিসাবে তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৮ সালের এপ্রিলে। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় ২১ মাস আগে বঙ্গভবন ছাড়ছেন তিনি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বঙ্গভবন ছেড়ে মো. সাহাবুদ্দিনের রাজধানীর গুলশানে নিজের বাসায় ওঠার কথা রয়েছে। সে কারণে কয়েক দিন ধরেই ওই বাসা বসবাসের উপযোগী করে গোছানো হচ্ছিল। পরিবারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও সেখানে নেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, রাষ্ট্রপতি গুরুতর অসুস্থ। বিভিন্ন রোগের কারণে শারীরিক ও মানসিকভাবে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করতে অসমর্থ হওয়ায় তিনি পদত্যাগ করেছেন। মো. সাহাবুদ্দিনের রাজনৈতিক পটভূমি নিয়েও কথা বলেন স্পিকার। তিনি বলেন, ‘তিনি মাফিয়া সরকারের আমলে নির্বাচিত হলেও বর্তমানে জনগণের ভোটে যে সরকার নির্বাচিত হয়েছে, তার প্রতি তিনি সব সময় সমর্থন ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন।’
পদত্যাগপত্রে মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়ে নিজের ভূমিকার একটি মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল শপথ নেওয়ার পর থেকে নিষ্ঠা, সততা ও সংবিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশে শাসনতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়েছিল বলে পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেন তিনি। সেই সংকট থেকে উত্তরণে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত চাওয়া এবং আদালতের পরামর্শে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কথাও তুলে ধরেন।
পদত্যাগপত্রে মো. সাহাবুদ্দিন লিখেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করেছে। নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠিত হয়েছে এবং সরকারি ও বিরোধী দল সংসদে দায়িত্ব পালন করছে। তাঁর ভাষায়, ‘আমার সুদৃঢ় ও ইতিবাচক ভূমিকার কারণে দেশে কোনো সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেনি।’
অসুস্থতাকে পদত্যাগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন মো. সাহাবুদ্দিন।
মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় পৌনে দুই বছর আগেই ছাড়লেন রাষ্ট্রপতির পদ।
জামায়াত বলল স্বৈরাচারের কালো ছায়া সরেছে, এনসিপি চাইল গ্রেপ্তার।
পদত্যাগপত্রে মো. সাহাবুদ্দিন বলেছেন, তিনি হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনির জটিলতায় ভুগছেন। তাঁর হৃদ্যন্ত্রে বাইপাস অস্ত্রোপচারও হয়েছে।
সম্প্রতি স্বাস্থ্য পরীক্ষায় মো. সাহাবুদ্দিনের ‘অটোনমিক নিউরোপ্যাথি’ শনাক্ত হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। আরও বলা হয়েছে, এই রোগের কারণে মাঝেমধ্যে তিনি ক্ষণিকের জন্য অচেতন হয়ে পড়েন। শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যের কারণে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হচ্ছে না এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন।তবে পদত্যাগপত্রে কোনো রাজনৈতিক চাপ কিংবা সরকারের সঙ্গে মতপার্থক্যের কথা উল্লেখ করা হয়নি।
রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগের আলোচনা প্রকাশ্যে আসে গত বুধবার। সরকার ও বিএনপির সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছিল, তাঁকে পদত্যাগের জন্য বিএনপির উচ্চপর্যায় থেকে বার্তা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়েও ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে আলোচনা চলছিল। তবে সরকার বা বিএনপি প্রকাশ্যে কখনো তাঁকে পদত্যাগ করতে বলেনি।
বঙ্গভবনের কর্মকর্তাদের একটি অংশ গতকালই জানতে পারেন, রাষ্ট্রপতি বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার বঙ্গভবনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন মো. সাহাবুদ্দিন। নিজের অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও চলতি মাসের মধ্যে বঙ্গভবন ছাড়ার প্রস্তুতি নিতে বলেন তিনি। রাষ্ট্রপতি মনোনীত কয়েকজন কর্মকর্তা ইতিমধ্যে ব্যক্তিগত মালামাল গুছিয়ে নিয়েছেন।
সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ চিকিৎসার জন্য ১৯ জুলাই থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে গিয়েছিলেন। তাঁর আগামীকাল রোববার দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগের আলোচনা শুরু হওয়ার পর সফর দুই দিন সংক্ষিপ্ত করে গতকাল দুপুরে ঢাকায় ফেরেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, গতকাল বিকেল চারটার দিকে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এ এস এম বাহাউদ্দিন বঙ্গভবন থেকে সাহাবুদ্দিনের স্বাক্ষর করা পদত্যাগপত্র নিয়ে জাতীয় সংসদ ভবনে যান। তিনি চিঠিটি স্পিকারের দপ্তরে পৌঁছে দেন। পরে স্পিকার জানান, বিকেল ৫টা ১ মিনিটে চিঠিটি আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর কাছে দাখিল করা হয়েছে।
বিকেল সাড়ে পাঁচটায় জাতীয় সংসদ ভবনের শপথকক্ষে সংবাদ সম্মেলনে আসেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, চিফ হুইপ মো. নুরুল ইসলামসহ সংসদ সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই হাফিজ উদ্দিন বলেন, সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র তিনি গ্রহণ করেছেন। চিঠিটি সংসদ সচিবালয়ের নথিতে সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়ে হাফিজ উদ্দি