রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় কাচালং নদীতে ভেঙে যাওয়া সিঁড়ি। গত বুধবার বারীবিন্দু ঘাট থেকে তোলা সমকাল
প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২৬
আরও পড়ুন
নিপীড়নের বিরুদ্ধে মশাল জ্বেলে গানে গানে প্রতিবাদ শিক্ষার্থীদের
সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলা। এই সময়ে কাচালং নদী উপচে প্লাবিত হয় উপজেলার চারটি ইউনিয়ন ও পৌরসভার বিস্তীর্ণ এলাকা। এখনও পৌর এলাকার কিছু মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, উপজেলাবাসীর অন্যতম দুর্ভোগের কারণ হচ্ছে কাচালং নদীর বারীবিন্দু ঘাট। ওই এলাকায় স্থায়ী বেড়িবাঁধ না থাকায় প্রতি বর্ষা মৌসুমে বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়।
টানা ১১ দিনের সাম্প্রতিক বর্ষণে বাঘাইছড়ি পৌরসভা ছাড়াও মারিশ্যা ইউনিয়ন, সাজেক ইউনিয়ন, রুপকারী ইউনিয়ন, বঙ্গলতলী ইউনিয়নসহ কয়েকটি ইউনিয়নে ব্যাপক ক্ষতি হয়। এই সময়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েন ৮০ হাজারের বেশি মানুষ। তাদের মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার মানুষকে উঠতে হয় আশ্রয়কেন্দ্রে।
গত বুধবার সরেজমিন দেখা গেছে, বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও বাঘাইছড়ি পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মাদ্রাসা এলাকা ও হাজীপাড়ার দুই হাজারের বেশি মানুষ এখনও পানিবন্দি রয়েছেন। কাপ্তাই বাঁধের পানি ছাড়ায় কিছুটা কমলেও এসব মানুষের দুর্ভোগ সীমাহীন। কিছু বাড়িঘর থেকে পানি নামলেও কাদামাটিতে ভরে আছে। রাস্তাঘাট ভেঙে যাওয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে পারছে না শিশু-কিশোররা।
এলাকাবাসী জানান, ভারতের মিজোরাম রাজ্যে উৎপন্ন কাচালং নদীটি সাজেক-মারিশ্যা-খেদারমারা ইউনিয়ন হয়ে কাপ্তাই হ্রদে মিশেছে। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই নদী নাব্য হারিয়েছে। ফলে প্রতি বর্ষা মৌসুমের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের পানি ধারণ করতে পারে না। বিশেষ করে বারীবিন্দু ঘাট এলাকা উপচে পানি পুরো উপজেলায় নিম্নাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। নাব্য সংকটের কারণে কাচালং নদীর গতিপথও এই ঘাটের কাছে বদলে গেছে। ফলে ভাঙনের শিকার হয়েছে তীরের দোকানপাট ও বসতবাড়ি।
বারীবিন্দু ঘাট এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, বন্যার পানি থেকে রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদসহ কয়েকটি সংস্থা ওই এলাকায় অস্থায়ী ব্যবস্থা নিয়েছে। এতে কয়েক দফায় ৮-১০ কোটি টাকা খরচ হলেও এলাকাবাসীর কোনো উপকারে আসেনি। সবই পানিতে গেছে। এই ঘাটের দোকানি বিনয় চাকমাসহ কয়েকজনের ভাষ্য, তারা ত্রাণ চান না, বারীবিন্দু ঘাট এলাকায় স্থায়ী বেড়িবাঁধ চান। ইতোমধ্যে নদীতে দুটি দোকান বিলীন হয়ে গেছে। নদীতীরের ৫-৬ হাত দূরে থাকা আরও তিনটি দোকান ভাঙনের ঝুঁকিতে আছে।
তুলাবান গ্রাম যুব সমাজের সভাপতি লিটন চাকমার ভাষ্য, উজানের পানি কাচালং নদী দিয়ে নেমে আসার সময় বারীবিন্দুঘাট এলাকায় উপচে পড়ে। তখন তুলাবান গ্রামসহ উপজেলার নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যায়। তাই এখানে স্থায়ী বাঁধ নির্মিত হলে উপজেলার পাহাড়ি-বাঙালি সব জনগোষ্ঠীর মানুষই উপকৃত হবেন।
ঘাট এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা সুশীল বিকাশ চাকমার দেওয়া তথ্যমতে, এলাকাবাসীর অনেকবার বেড়িবাঁধ নির্মাণের আবেদন করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বারীবিন্দু ঘাটে বেড়িবাঁধের নির্মাণের অনুমোদন হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্পটি পরবর্তী সময়ে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়। এ কারণে বারীবিন্দু ঘাটের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়ে উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন এলাকা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড বারীবিন্দু ঘাট এলাকায় পলিব্যাগ ফেলেছে। কিন্তু এসব পর্যাপ্ত ছিল না। ওই এলাকায় আরও বেশি পলিব্যাগ দেওয়া হলে এ রকম বন্যার শিকার হতে হতো না।
এলাকাবাসীর বক্তব্যের সত্যতা স্বীকার করেন রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য দেবপ্রসাদ দেওয়ান। তিনি বলেন, বারীবিন্দু ঘাট পয়েন্ট দিয়ে কাচালং নদীর পানি উপচে বন্যা দেখা দেয়। এতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন উপজেলাবাসী। এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে জেলা পরিষদ থেকে পাউবোর সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।
পাউবো রাঙামাটির নির্বাহী প্রকৌশলী তনয় কুমার ত্রিপুরা কাচালং নদীর বারীবিন্দু ঘাট এলাকায় ৫০০ মিটার অংশে আরসিসি ব্লক বসানোর আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, এ কাজটি সম্পন্ন হলে বাঘাইছড়ি উপজেলা সদরে পানি ঢোকার আশঙ্কা থাকবে না। তাঁর ভাষ্য, লংগদু উপজেলার মাইনি বাজার এলাকা থেকে বাঘাইছড়ি উপজেলার মারিশ্যা লঞ্চঘাট পর্যন্ত কাচালং নদীর ৮ কিলোমিটারের বেশি অংশে খননের দরপত্র দেওয়া হয়েছে। এবার পানি কমে গেলেই খননের কাজ শুরু হবে।