১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদের ঘটনার মধ্য দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বীজ বপন হয়েছিল। পূর্ববঙ্গের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের জন্য সে সময় নয়টি কলেজ থাকলেও উচ্চশিক্ষার জন্য ছিল না কোনও বিশ্ববিদ্যালয়।

১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় শতাব্দীপ্রাচীন এই বিশ্ববিদ্যালয়টি।

নিপীড়নের বিরুদ্ধে মশাল জ্বেলে গানে গানে প্রতিবাদ শিক্ষার্থীদের আরও পড়ুন নিপীড়নের বিরুদ্ধে মশাল জ্বেলে গানে গানে প্রতিবাদ শিক্ষার্থীদের

সে সময় সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

শতবর্ষ পার করে এখন ১০৩ বছরে পা দিয়েছে এই ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়। তবে এর জমির মালিকানা নিয়ে এখনও রয়েছে নানা মতবিরোধ।

বিজ্ঞাপন

১৯১২ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ।

এর মাত্র তিন দিন আগে ভাইসরয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আবেদন জানিয়েছিলেন ঢাকার নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ, ধনবাড়ির নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, শের-এ-বাংলা হিসেবে পরিচিত রাজনীতিবিদ এ কে ফজলুল হক এবং অন্যান্য কয়েকজন নেতা।

ইতিহাসবিদরা বলছেন বঙ্গভঙ্গ রদ করার 'ক্ষতিপূরণ' হিসাবেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে তখনকার ব্রিটিশ সরকার।

'ঢাকা স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী' বইতে ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন লিখেছেন, ''বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতিপূরণ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। লর্ড লিটন যাকে বলেছিলেন, 'স্প্লেনডিড ইম্পেরিয়াল কমপেনসেশন'।"

তিনি আরও লেখেন, ''পূর্ববঙ্গ শিক্ষাদীক্ষা, অর্থনীতি সব ক্ষেত্রেই পিছিয়ে ছিল। বঙ্গভঙ্গ হওয়ার পর এ অবস্থার খানিকটা পরিবর্তন হয়েছিল, বিশেষ করে শিক্ষার ক্ষেত্রে।"

এর পরে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের প্রস্তাব করা হয়।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে লন্ডনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর ভারত সরকার ১৯১২ সালের ৪ঠা এপ্রিল এক চিঠির মাধ্যমে বাংলার সরকারকে বিশদ পরিকল্পনা এবং এর আর্থিক খরচ সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়।

২৭শে মে লন্ডনের ব্যারিস্টার রবার্ট নাথানকে প্রধান করে ১৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। নাথান কমিটি নামে পরিচিত এই কমিটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি প্রকল্প প্রণয়ন করে।

প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবিত অবকাঠামোর ইমারতের নকশা-সহ ৫৩ লাখ টাকা মূল ব্যয় ধরা হয়। পরবর্তীকালে গণপূর্ত বিভাগ এটিকে ৬৭ লাখ টাকায় উন্নীত করে। এছাড়া ১২ লাখ টাকা বাৎসরিক ব্যয় ধরা হয়।

এই কমিটি মত দেয়, যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার, লিডস, লিভারপুল প্রভৃতি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই এই প্রতিষ্ঠানটিও হতে হবে একক আবাসিক শিক্ষাক্ষেত্র। ঢাকার সাতটি কলেজ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাভুক্ত থাকবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করে কমিটি।

কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকার ছোট প্রকল্প বাস্তবায়নও সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

পরে ১৯১৭ সালে লর্ড চেমসফোর্ড কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যাসমূহ খতিয়ে দেখার জন্য মাইকেল স্যাডলারকে প্রধান করে একটি কমিশন গঠন করেন।

যার নাম ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন বা স্যাডলার কমিশন। এই কমিশনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ইতিবাচক প্রতিবেদন দেয়।

এই কমিশন মোট ১৩টি সুপারিশ করেছিল, যার একটি ছিল এটি হবে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং আর একটি - বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সিল হাউজের পাঁচ মাইল ব্যাসার্ধ এলাকাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাভুক্ত করা।

১৯১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইমপেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্য খান বাহাদুর আহসানউল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন।

ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে শুরু থেকে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহর। কিন্তু, হঠাৎ করে ১৯১৫ সালে তাঁর মৃত্যু ঘটলে ধনবাড়ির নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী শক্ত হাতে এই উদ্যোগের হাল ধরেন।

শেষ পর্যন্ত ১৯২০ সালের ১৩ই মার্চ ভারতীয় আইন সভায় 'দ্য ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট ১৯২০' অনুমোদিত হয়। গভর্নর জেনারেল সেই আইনে স্বাক্ষর করেন ২৩শে মার্চ।

স্যাডলার কমিশনের অন্যতম সদস্য, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক রেজিস্ট্রার স্যার ফিলিপ জোসেফ হার্টগ ১৯২০ সালের পহেলা ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসাবে নিয়োগ পান।

পরের বছর, ১৯২১ সালের পহেলা জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করে।

রমনা এলাকায় ঢাকার নবাব পরিবারের দান করা ৬০০ একর জমি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা হয়েছে। নবাব সলিমুল্লাহর নামটিই এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি নিয়ে এমন একটি বহুল প্রচলিত তথ্য আমরা সবাই জানি।

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও রেকর্ডে এই তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায় না।

রমনার যে জমিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গোড়াপত্তন তার পুরোটাই খাস জমি বলে বিভিন্ন দলিল-দস্তাবেজ ও ইতিহাসের বইতে উল্লেখ করা হয়েছে।

‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ : ‘অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের আলাপচারিতা ও অন্যান্য’ সরদার ফজলুল করিমের লেখা একটি বই।

সরদার ফজলুল করিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার টাকা, জমির উৎস এবং সলিমুল্লাহ হল সম্পর্কে জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের কাছে জানতে চেয়েছিলেন।

বইটিতে বলা হয়েছে, আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “কোনও মুসলমান ধনীর কাছ থেকেই ঢাকা ইউনিভার্সিটি ডাইরেক্টলি কোনও ফাইন্যান্সিয়াল কন্ট্রিবিউশন পায় নাই। সলিমুল্লাহ হল যে তৈরি হল তা পুরোই সরকারের টাকায়। নওয়াব পরিবারের টাকায় নয়; জায়গাতেও নয়। রমনায় যে জায়গায় ঢাকা ইউনিভার্সিটি, তা পুরোটাই খাসমহল এবং সরকারের জমি, সেটেলমেন্ট রিপোর্টে তাই আছে।”

রমনার যে এলাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন প্রতিষ্ঠা হয়েছে সেখান থেকে শাহবাগের জাতীয় জাদুঘর পর্যন্ত নবাব পরিবারের জমি ছিল বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ