অনেকেই ক্লান্ত, ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত করতল বিছিয়ে শুয়ে থাকা বুড়ো সান্তিয়াগোর মধ্যে যিশুর খোঁজ পান। ১৯৫৪ সালে ভাগ্য ও সমুদ্রের সঙ্গে লড়তে থাকা এক বৃদ্ধ জেলের কাহিনি নিয়ে লেখা দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি উপন্যাসের জন্য নোবেল পুরস্কার পান আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। আফ্রিকার গভীর জঙ্গলে শিকারে গিয়ে বিমান দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে আহত হলে সে বছর তিনি সুইডিশ একাডেমিতে সশরীর উপস্থিত হতে পারেননি। তবে তাঁর লিখিত বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পাঠ করেছিলেন। পরে সুস্থ হয়ে উঠলে হেমিংওয়ে সেই বক্তব্য নিজের কণ্ঠে রেকর্ড করেন। তিনি ছিলেন গত শতকের সবচেয়ে জনপ্রিয় আমেরিকান ঔপন্যাসিক। তাঁর সময়ে খুব কম লেখকই ছিলেন, যাঁদের জীবন ছিল এতটা বর্ণিল ও বিচিত্র। জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি কিউবায় কাটিয়েছিলেন। এখানে তিনি একটি খামারবাড়ি ক্রয় করে মৎস্য শিকারসহ নানা ধরনের অ্যাডভেঞ্চার এবং সাহিত্যের নানামুখী প্রচারণা ও বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। শেষ সময়টা তাঁর গেছে বরং বিরূপ সমালোচনায়। ১৯৫০ সালে লেখা তাঁর উপন্যাস অ্যাক্রস দ্য রিভার অ্যান্ড ইনটু দ্য ট্রিজ অসফল হলে তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়টা বেশ সমস্যাকীর্ণ হয়ে পড়ে। জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ এক কর্নেলের জীবনকাহিনি নিয়ে উপন্যাসটি রচিত।

১৯৫২ সালে দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি প্রকাশিত হলে তিনি আবার পাঠকদৃষ্টিতে চলে আসেন। এ উপন্যাস প্রকাশের পর ১৯৫৩ সালে তাঁকে পুলিৎজার পুরস্কার দেওয়া হয় এবং পরের বছরই তিনি নোবেল পুরস্কার পান।

শিল্প, জলবায়ু ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তিকে একসূত্রে আনল ‘দ্য তত্ত্বমসি সার্কেল’ আরও পড়ুন শিল্প, জলবায়ু ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তিকে একসূত্রে আনল ‘দ্য তত্ত্বমসি সার্কেল’

১৮৯৯ সালের ২১ জুলাই এই আমেরিকান ঔপন্যাসিক ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের ওক পার্কে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম আর্নেস্ট মিলার হেমিংওয়ে। তাঁর বাল্য ও অবকাশ সময়টা কেটেছে মিশিগানে মৎস্য শিকারে ও হান্টিংয়ে। তাঁর বাবা ছিলেন একজন খ্যাতনামা চিকিৎসক এবং শৌখিন খেলোয়াড়। মা ছিলেন সংগীত ও চিত্রকলায় পারদর্শী। বালকের ভবিষ্যৎ নিয়ে মা–বাবার মধ্যে বিরোধ ছিল। মা চেয়েছিলেন ছেলে সংগীতে তাঁর প্রতিভার বিকাশ ঘটাক। অপর পক্ষে বাবা তাঁকে বাইরের জগতে টানছিলেন। বাবাই জয়ী হয়েছিলেন অবশেষে। মাত্র ৩ বছর বয়সে তিনি তাঁর হাতে তুলে দেন মাছ ধরার বড়শি এবং ১১ বছর বয়সে বন্দুক। শৈশবের দিনগুলো কেটেছে বন্দুক ঘাড়ে জঙ্গলে জঙ্গলে অথবা কোনো বৃহৎ দিঘিতে মাছের সন্ধানে নৌকা বেয়ে। খোলা আকাশের নিচে তাঁবু খাটিয়ে রাতে লণ্ঠনের আলোয় বই পড়া ছিল তাঁর শখ। স্কুলে পড়াকালীন তিনি ডিবেটিং ক্লাবের সদস্য ছিলেন এবং ওয়াটার বাস্কেটবল টিমের ক্যাপ্টেন হিসেবে সাফল্যের সঙ্গে টিম পরিচালনা করেছেন। ভালো সাঁতারু হিসেবেও তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সেই স্কুলজীবন থেকেই।

স্কুলে পড়াকালীন ইংলিশ কোর্সের ছাত্র হিসেবে তিনি ফিকশনের দিকে মনোনিবেশ করেন এবং তখন থেকেই বিভিন্ন লিটারেরি ম্যাগাজিনে লিখতে শুরু করেন। স্পোর্টস রিপোর্টার হিসেবে কাজ করার আগ্রহও তখন থেকেই দেখা যায় তাঁর মধ্যে। ১৯১৭ সালে ওক পার্ক স্কুল থেকে তিনি গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন ১৯১৮ সালে রেড ক্রসের অধীন স্বেচ্ছাসেবক অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার হিসেবে ইতালিয়ান আর্মির সঙ্গে কর্মরত থেকেছেন। যুদ্ধের মাঠের অভিজ্ঞতা আমরা দেখতে পাই তাঁর বিভিন্ন উপন্যাস ও গল্পে। ১৯১৮ সালের ৮ জুলাই তিনি যখন ইতালিয়ান আর্মিদের চকলেট বিতরণ করছিলেন একটি অস্ট্রেলিয়ান মর্টার এসে তাঁকে আঘাত করলে তিনি গুরুতর আহত হন এবং তাঁকে মিলানের রেড ক্রস হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এই আঘাতে তিনি এমনভাবে আহত হয়েছিলেন যে তাঁকে প্রায় তিন মাস হাসপাতালেই কাটাতে হয়। এখানেই হেমিংওয়ে অ্যাগনেস ভন কুরোস্কির প্রেমে পড়েন। তিনি ছিলেন আমেরিকান রেড ক্রসের একজন সেবিকা। অ্যাগনেসের বয়স তখন ২৬ আর হেমিংওয়ের ১৮ বছর। বয়সের ব্যবধানের কারণে অ্যাগনেস তাঁকে বিয়ে করতে রাজি হননি। আ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস–এর ক্যাথরিন বার্কলের মধ্যে অ্যাগনেসকে খুঁজে পাওয়া যায়।

বিজ্ঞাপন

যুদ্ধের শেষে হেমিংওয়ে শিকাগোতে ফিরে আসেন এবং ১৯২১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর হ্যাডলি রিচার্ডসনকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তিনি টরন্টো স্টার পত্রিকার জন্য ভ্রাম্যমাণ করেসপন্ডেন্ট হিসেবে সারা ইউরোপ ভ্রমণ করেন। তাঁর হেড অফিস ছিল প্যারিস। প্যারিসে পৌঁছে তিনি ফোর্ড মেডক্স ফোর্ড, শেরউড অ্যান্ডারসন, জেমস জয়েস, এজরা পাউন্ড ও গার্ট্রুড স্টেইনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় পত্রিকা অফিস থেকে তাঁর লেখা বারবার ফিরে এলে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। অবশেষে ১৯২৬ সালে দ্য সান অলসো রাইজেস প্রকাশিত হলে তিনি লেখক হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেন। এই উপন্যাসে তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে প্যারিসে থেকে যাওয়া হতভাগ্য আমেরিকানসহ অন্য ইউরোপিয়ানদের বোহেমিয়ান, রুটলেস জীবনযাপনের সচিত্র প্রতিবেদন এঁকেছেন, যখন কোনো নতুন মূল্যবোধ দানা বেঁধে ওঠেনি; গার্ট্রুড স্টেইন যাদের ‘লস্ট জেনারেশন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। এরপর প্রকাশিত হয় আ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস (১৯২৯) তাঁর বহুল পঠিত উপন্যাস। এ উপন্যাসে যুদ্ধের সময়ে একজন আমেরিকান সৈনিক এবং ইংলিশ নার্সের মধ্যকার ট্র্যাজিক প্রেমকাহিনি বর্ণিত হয়েছে। প্রথম বিয়ে ভেঙে গেলে হেমিংওয়ে পলিন ফেইফারকে বিয়ে করেন ১৯২৭ সালে। মেয়েটি প্যারিসেই একটি পত্রিকা অফিসে কাজ করতেন এবং তাঁদের বিয়ে প্যারিসেই অনুষ্ঠিত হয়। ১৯২৮ সালে তিনি তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীসহ যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসেন এবং ফ্লোরিডার কি ওয়েস্টে বসবাস শুরু করেন। ১৯২৮ থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত তিনি কি ওয়েস্টেই বসবাস করেন এবং একজন স্পোর্টসম্যান হিসেবে বেশ খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত হয় গ্রিন হিলস অব আফ্রিকা। সামাজিক অবক্ষয়সহ সাহিত্য ও শিকারের নানা কাহিনি এ বইয়ের উপজীব্য বিষয় হয়ে উঠেছে।

১৯৩৬ সালের ১৬ জুলাই স্পেনে ফ্যাসিস্ট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে তিনি রিপাবলিকানদের পক্ষ নেন এবং স্পেনের কৃষকদের নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি সিনেমা দ্য স্প্যানিশ আর্থ বানানোর জন্য ১৯৩৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯ মে পর্যন্ত স্পেনে অবস্থান করেন। ১৯৩৭ সালের ১৪ আগস্ট হেমিংওয়ে আবার স্পেনে যান এবং সেখানে ১৯৩৮ সালের ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত অবস্থান করেন। এ সময়ে এখানে তাঁর পরিচয় হয় মার্থা গেলহর্নের সঙ্গে। মার্থা তখন কলিয়ার্স ম্যাগাজিনের হয়ে গৃহ