জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের যে সংগ্রাম ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই দেশবাসীকে আবেগে উদ্বেল করে তুলেছিল, তারই বিজয়ের দিন ‘৩৬ জুলাই’ বা ৫ আগস্ট। দ্বিতীয়বারের মতো সেসব স্মৃতি সবার সামনে এখন। প্রশ্ন হলো, কীভাবে আমরা স্মরণ করছি গণ–অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী? ব্যর্থতার হতাশায়, নাকি আনন্দে-উৎসবে? নাকি জরুরি কোনো শিক্ষা ও শপথে?
রাজনৈতিক আন্দোলনে এত অল্প কয় দিনে এত মানুষের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। ন্যায়সংগত সমাজ এবং পরিবর্তনের ক্ষুধা বাংলাদেশে যে কত তীব্র, তারই চূড়ান্ত নজির ‘লাল জুলাই’। কিন্তু ক্ষুধার প্রতিদান পেল কি ‘সমাজ’?
আরও পড়ুন
নিপীড়নের বিরুদ্ধে মশাল জ্বেলে গানে গানে প্রতিবাদ শিক্ষার্থীদের
ক্ষুধা একটা অবস্থার কথা জানায়। তখন খাবার এগিয়ে দেওয়ার ভূমিকা নিতে হয় কাউকে। রাজনীতিবিদেরা কতটা সফল হলেন সে রকম ভূমিকায়? রক্তাক্ত ‘চব্বিশ’ দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্মাণে কী দিয়ে গেল? কী চেয়ে কী পেল নাগরিক সমাজ? গণ–অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে তার তদন্ত ছাড়া শহীদ ও তাঁদের প্রত্যাশার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আর সঠিক উপায় কি আছে?
২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বড় প্রাপ্তি অবশ্যই ফেব্রুয়ারিতে হয়ে যাওয়া জাতীয় নির্বাচন। গত আড়াই দশকে বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংস হতে হতে শেষমেশ জাতীয় লজ্জার বিষয় হয়ে গিয়েছিল। প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল আমলাতন্ত্রের সহায়তা নিয়েই সেটা করতে পেরেছে। অনেক বিদেশি শক্তিও তাদের সহায় ছিল। সেই সময়ের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে তার জন্য আজও কোনো অনুশোচনা নেই, যা মহা বিস্ময়কর।
বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনী ব্যবস্থা গণতন্ত্রের সামান্য উপাদান। তবে সবচেয়ে জরুরি উপাদান। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্তরা জানে, চলতি ধারার নির্বাচনে বিজয়ীরা শ্রেণিগতভাবে তাদের লোক নয়। তারপরেও জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে সুষ্ঠু নির্বাচনী ব্যবস্থা দেখতে চায় তারা। এটা থাকলেই কেবল তারা নিয়মতান্ত্রিক পথে সংগ্রামের পরবর্তী স্তরে এগোতে পারে। এই বিবেচনায় দেশে একটা সংসদ কাজ করছে, সেটা গণ–অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে দরকারি অর্জন। যেকোনো মূল্যে একে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে ধরে রাখতে হবে।
কিন্তু সংসদ সদস্যদের ভূমিকায় মনে হচ্ছে না গণ–অভ্যুত্থানের বিষয়টা তাঁদের ভাবনায় গুরুত্বের সঙ্গে আছে। এই সংসদ যে সাধারণ কোনো নির্বাচনে পাওয়া সংসদ নয়, এর ‘রাজনৈতিক মালিক’ যে চব্বিশের শহীদ ও সক্রিয়রা—সেই বোধের ব্যবহারিক প্রকাশ সংসদে পাওয়া যায়নি এখনো।
সরকারি দল ও বিরোধী দলের ভূমিকা দেখে মনে হচ্ছে তারা কেবল নিজ নিজ দলের কীর্তিগাথার পাল্টাপাল্টি বয়ান শোনাতে গেছে সেখানে। উভয় দল গণ–অভ্যুত্থানের ‘এজেন্সি’ দাবি করছে, কিন্তু কোনো তরফ থেকেই ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বদলের প্রবল তাগিদ দেখা যায়নি । ২০২৪–এর রাজপথ কিন্তু সেটাই চেয়েছিল। এই সংসদের মালিক সেসব মিছিলের পরিবর্তনবাদী শহীদেরাই, যে মিছিলগুলোতে এই সংসদের অনেকেও শরিক ছিলেন। ফলে তাঁদের কাছে প্রবল প্রত্যাশা সমাজের।
২০২৪–এর আগস্টের পর থেকে দেশে সংস্কারধর্মী কর্মসূচি তৈরি করতে ১১টি কমিশন এবং আরও কিছু কমিটি গঠন করা হয়। সেসব কমিশনের প্রতিবেদন ও সুপারিশও পেশ হয়েছিল। সংসদের গত ৪-৫ মাসে কোনো দলের পক্ষ থেকে সেসবের বাস্তবায়নের বিষয়ে কিছু এগোচ্ছে না।
জাতীয় নির্বাচন হলো, কিন্তু নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার হলো না। স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে শিগগিরই, অথচ স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এ অবস্থায় স্থানীয় সরকারের যত জনপ্রতিনিধিই আসুন, তাঁরা একটি বিশেষ ক্যাডারের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মুখাপেক্ষী হয়েই থাকবেন। ‘চব্বিশ’ কি এটাই চেয়েছিল?
নতুন সংসদের শুরুতে সংরক্ষিত আসনে নারীরা কোটা অনুযায়ী আসন পেলেন, কিন্তু তাঁদের কেউ নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন নিয়ে আর কথা বলছেন না। আবু সাঈদদের মিছিলের হাজার হাজার নারী সহযোগীর কথা ভুলে গেলাম আমরা সবাই।
দেখা যাচ্ছে, কোনো সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনই সংসদ সদস্যদের কাছে আর গুরুত্ব পাচ্ছে না। তাহলে আগের সংসদগুলো থেকে এই সংসদ কীভাবে আলাদা?
সংসদের গত দুটি অধিবেশন নিয়ে অনেক পর্যালোচনা হচ্ছে। বিএনপি ও জামায়াত জোট উভয়ে সেখানে বারবার গণ–অভ্যুত্থানের মালিকানা দাবি করছিল। কিন্তু যে অভ্যুত্থানে শহীদদের বড় অংশই শ্রমিক—সেই শ্রমজীবীদের মজুরি বাড়ানোর ন্যূনতম উদ্যোগ সংসদ এখনো নেয়নি। বিরোধী দলের কাছ থেকেও এ বিষয়ে জোরালো কোনো দাবি ছিল না। অথচ আবু সাঈদদের আত্মাহুতি দেখে সবার আগে ব্যারিকেড গড়েন যাত্রাবাড়ী, সাভার ও গাজীপুরের শ্রমিকেরা।
এখনকার বিদ্যমান নিয়মেই ২০২৬ সালে তৈরি পোশাক, চাসহ ১৩টি খাতে নতুন মজুরিকাঠামো ঘোষণার কথা। অভ্যুত্থানের সুবিধাভোগী কোনো তরফ থেকে সেসব নিয়ে কথা নেই। তাহলে শ্রমিক সমাজ গণ–অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিক কীভাবে উদ্যাপন করবে? ছাত্র-শ্রমিক-জনতার যে ব্র্যান্ড স্লোগান ছিল ‘বৈষম্য’ কমানোর, তা কি কেবলই ছিল কথার কথা?
এ বছরের প্রথম ছয় মাসে পোশাক খাতে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক ছাঁটাইয়ের খবর প্রকাশিত হয়েছে খোদ বিজিএমইএর সূত্রে (প্রথম আলো, ৬ জুলাই)। এই প্রতিবেদনের পরদিন একই কাগজের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫৩ মাস ধরে দেশে মজুরির চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি। অর্থাৎ আগের সরকারের আমলে যা ছিল, গণ–অভ্যুত্থানের পরের দুই সরকারের আমলেও একই প্রবণতা চলছে।
শ্রমজীবীদের এই অবস্থার মধ্যে সরকারের প্রথম বাজেটেই রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামোর জন্য বরাদ্দ থাকছে। স্পষ্টত দেখা যাচ্ছে, নিচুতলার অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের নিত্যদিনের টানাপোড়েন নয়, সামরিক–বেসামরিক প্রশাসনকে খুশি রাখতে সচেষ্ট আছে গণ–অভ্যুত্থানের পরের রাজনীতি।
রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের মজুরি বাড়ানো ন্যায্য হলে বেসরকারিদের জন্য ও শ্রমিকদের জন্য নয় কেন? উভয়ের বসবাস তো একই বাজারেই। তা ছাড়া, কথা ছিল এই প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ এবং তার ঔপনিবেশিক ধরন বদলানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। সেই আয়োজন কই?
গণ–অভ্যুত্থানের আগের আমলে রাজনৈতিক-প্রশাসনিক যা কিছু অনাচার হয়েছে, তাতে আমলা সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকার কোনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন ও জবাবদিহি এখনো হলো না। সে রকম অনাচারের ভবিষ্যৎ রাস্তা কি আদৌ বন্ধ করা গেল? দুর্ভাগ