হলুদ রঙের থোকা থোকা ফল। দূর থেকে দেখলে দেশীয় লটকন বলে ভুল হতে পারে। হাতে নিলে অবশ্য সেই ধারণা পাল্টে যায়। লটকনের চেয়ে ফলটি কিছুটা লম্বাটে, আকারে ছোট। কামড় দিলে শক্ত শাঁসে মচমচে অনুভূতি, সঙ্গে হালকা কষ আর মিষ্টি স্বাদ।
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বাজারে কয়েক দিন ধরে এমন হলুদ খেজুরের দেখা মিলছে। ফলের দোকান, ফুটপাত কিংবা ভ্যান—সবখানেই স্তূপ করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে ফলটি। কোথাও বলা হচ্ছে মিসরের খেজুর, কোথাও সৌদি আরব কিংবা দুবাইয়ের। তবে আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে এখন যে কাঁচা খেজুর বেশি বিক্রি হচ্ছে, তার পুরোটাই আসছে ভারত থেকে।
আরও পড়ুন
বিশ্বকাপ দেখতে আসা বাংলাদেশিদের ২২% কানাডায় অ্যাসাইলাম চেয়েছেন এখন পর্যন্ত
এসব খেজুরের দাম এখন আগের তুলনায় অনেক কম। কয়েক বছর আগেও বিদেশ থেকে আনা এমন খেজুর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হতো। এখন চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে মান ও স্থানভেদে প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। দাম কমায় ফলটি আর কেবল অভিজাত বিপণিবিতান কিংবা নির্দিষ্ট ক্রেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ভ্যানেও বিক্রি হচ্ছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতারাও কৌতূহল থেকে কিনছেন।
চট্টগ্রাম নগরের ২ নম্বর গেট এলাকায় সম্প্রতি ভ্যানে করে কাঁচা খেজুর বিক্রি করছিলেন মোকাব্বের আলী। তাঁর সামনে ছোট ছোট স্তূপে সাজানো হলুদ ফল। পথচারীদের কেউ থেমে ফলটি হাতে নিয়ে দেখছিলেন, কেউ দাম জিজ্ঞেস করছিলেন। অনেকে আধা কেজি কিংবা এক কেজি করে কিনে নিচ্ছিলেন।
মোকাব্বের আলী বলেন, প্রথম দেখায় অনেকে ফলটিকে লটকন মনে করেন। এর স্বাদ নিয়ে লোকজন আবার কিনতে আসেন। অনেকটা নতুন ধরনের ফল হওয়ায় ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি। তিনি চট্টগ্রাম নগরের স্টেশন রোডের আড়ত থেকে প্রতি কেজি ২৫০ টাকায় কিনে এনে ৩০০ টাকায় বিক্রি করছেন। প্রতিদিন তাঁর ৪০ থেকে ৫০ কেজি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
নগরের আগ্রাবাদ মোড়ে একই খেজুর বিক্রি হচ্ছিল প্রতি কেজি ৩২০ টাকায়। ফলমন্ডি থেকে পাইকারি কিনে ভ্যানে বিক্রি করছিলেন মোহাম্মদ হানিফ। তিনি ক্রেতাদের বলছিলেন, খেজুরটি সৌদি আরব থেকে এসেছে। এবারই প্রথম তিনি কাঁচা খেজুর বিক্রি করছেন। প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ কেজি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলে জানালেন তিনি।
প্রবর্তক মোড়ে ফল বিক্রেতা মোমিন উল্লাহ প্রতি কেজি ৩০০ টাকায় খেজুর বিক্রি করছিলেন। তাঁর দাবি, ফলটি দুবাই থেকে আনা হয়েছে। তাঁর সঙ্গে কথা বলার সময় কাঁচা খেজুর কিনতে এলেন বেসরকারি চাকরিজীবী মোহাম্মদ দিদার। তিনি ১০০ টাকার খেজুর কিনে একটি মুখে দিয়ে বললেন, ‘বাহ্, মিষ্টি।’
দিদার বলেন, এর আগে কখনো এই কাঁচা খেজুর খাননি। কয়েক দিন ধরে আশপাশের মানুষকে ফলটি কিনতে দেখে তাঁরও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। প্রথমবার অল্প পরিমাণ কিনেছেন। স্বাদ ভালো লাগলে পরে আবার কিনবেন।
পুষ্টিবিদদের মতে, খেজুরে প্রাকৃতিক শর্করা, খাদ্য আঁশ, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও বিভিন্ন অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট থাকে। কাঁচা অবস্থায় খাওয়া খেজুরেও এসব পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়। তবে ফলটি মিষ্টি হওয়ায় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের পরিমাণ বিবেচনা করে খেতে হবে।
নাম মধ্যপ্রাচ্যের, খেজুর ভারতের
খুচরা বিক্রেতাদের কেউ ফলটিকে মিসরের, কেউ সৌদি আরবের, আবার কেউ দুবাইয়ের বলে বিক্রি করছেন। কক্সবাজারে এটি ‘মিসরি হলুদ খেজুর’ নামেও পরিচিতি পেয়েছে। কিন্তু চট্টগ্রামের পাইকারি ফল ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকেরা বলছেন, এবার বাজারে থাকা কাঁচা খেজুরের বড় অংশ ভারত থেকে এসেছে।
চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় পাইকারি ফলের বাজার ফলমন্ডিতে এখন প্রায় প্রতিদিন ট্রাকে করে কাঁচা খেজুর ঢুকছে। ভারত থেকে বেনাপোল স্থলবন্দর হয়ে এসব চালান বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। সেখান থেকে পণ্য যাচ্ছে চট্টগ্রাম, ঢাকা, যশোর, সিলেট ও দেশের অন্যান্য বাজারে।
ফলমন্ডির মেসার্স আল্লাহর দয়া স্টোরের কর্ণধার সাহাব উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, দুই বছর ধরে ভারতে কাঁচা খেজুরের ফলন ভালো হচ্ছে। আগে এ ধরনের খেজুর মূলত সৌদি আরব, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও থাইল্যান্ড থেকে আসত। বেশির ভাগ চালান বিমানে আনা হতো। আমদানি ও পরিবহন ব্যয় বেশি হওয়ায় খুচরা বাজারে প্রতি কেজির দাম ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা পর্যন্ত পড়ত। ভারত থেকে সড়কপথে সরাসরি খেজুর আসায় এবার পরিবহন ব্যয় অনেকটাই কমেছে। সরবরাহও বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দামে। সাহাব উদ্দিনের মতে, দাম নাগালের মধ্যে চলে আসায় সাধারণ ক্রেতাদের কাছেও ফলটি জনপ্রিয় হচ্ছে।
পাইকারি বাজারে প্রতি ১০ কেজির এক ক্রেট কাঁচা খেজুর মানভেদে ১ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভালো মানের বড় ও শক্ত ফলের দাম বেশি। ফল নরম হয়ে গেলে দাম দ্রুত কমে যায়। কোনো কোনো দিন এক ক্রেট ১ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আবার মান খারাপ হলে তা ১ হাজার ৫০০ টাকা কিংবা আরও নিচে নেমেছে।
আমদানিকারক মোহাম্মদ আলী জুবায়ের খান কাঁচা খেজুরের ব্যবসা করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম—হজরত বেলায়ত আলী শাহ ফার্ম। জুবায়ের বলেন, প্রতিবছরই ভারত থেকে সীমিত পরিমাণে কাঁচা খেজুর আসে। এবার আমদানি বেড়েছে। মৌসুমের শুরুতে দাম ভালো থাকলেও চাহিদার তুলনায় বেশি পণ্য ঢুকছে। এতে এখন অনেক আমদানিকারক ও ব্যবসায়ী লোকসানের ঝুঁকিতে পড়েছেন। বর্তমানে বাজারে বেশি বিক্রি হওয়া হলুদ কাঁচা খেজুর ভারতের রাজস্থান থেকে আসছে।
২৪ টনের ট্রাক, সময় মাত্র কয়েক দিন
কাঁচা খেজুরের ব্যবসায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি এর স্থায়িত্ব কম। গাছ থেকে সংগ্রহের পর দ্রুত বাজারে পৌঁছাতে না পারলে ফল নরম হয়ে যায়। কখনো রং বদলে বাদামি হতে শুরু করে, আবার কখনো পচে যায়। আমদানিকারক মোহাম্মদ আলী জুবায়ের খান বলেন, গাছ থেকে পাড়ার দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই খেজুর বাজারে পৌঁছানো জরুরি। ভারত থেকে সাধারণ ট্রাকে খোলা অবস্থায় পণ্য আসে। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত পরিবহন ও সংরক্ষণব্যবস্থা না থাকায় খেজুর দীর্ঘ সময় ভালো রাখা যায় না।
জুবায়ের খান জানান, একটি ট্রাকে প্রায় ২৪ টন কাঁচা খেজুর থাকে। তাঁর প্রতিষ্ঠান মৌসুমে ১৫ থেকে ৩০ ট্রাক পর্যন্ত খেজুর আমদানি করে। এবারও তিনি ইতিমধ্যে ১৫ থেকে ২০ ট্রাকের মতো পণ্য এনেছেন। তবে ফল দ্রুত নষ্ট হওয়ার কারণে বাজারে দাম পড়ে গেলে সেটি ধরে রাখার সুযোগ নেই। তখন কম দামেই বিক্রি করতে হয়।
কাঁচা খেজুরের মৌসুমও ছোট। জুলাই