ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধির পর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি আবারও বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।

স্থায়ীভাবে সংঘাত অবসানের পথ সুগম করার উদ্দেশ্যে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি সইয়ের মাত্র এক মাস পরই দুই দেশ আবারও একে অপরের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করেছে।

চট্টগ্রামের হালিশহরে কারখানায় আগুন আরও পড়ুন চট্টগ্রামের হালিশহরে কারখানায় আগুন

নতুন করে উত্তেজনা বাড়ায় তেলের দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে।

যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাহলে উপসাগরীয় রপ্তানিকারকরা তাদের তেল ও গ্যাস বাজারে পৌঁছাতে কি বিকল্প রুট ব্যবহার করতে পারবেন?

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে, তবে বর্তমানে এর কোনোটিই এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের পূর্ণাঙ্গ বিকল্প হতে পারবে না।

ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি এখনো উপসাগরীয় অঞ্চলে উৎপাদিত তেল ও গ্যাসের বড় অংশের প্রধান রপ্তানি পথ। এর কারণ এই রুটের ব্যাপক সক্ষমতা, নমনীয়তা এবং ব্যয়-সাশ্রয়ী বৈশিষ্ট্য।

পাইপলাইন নেটওয়ার্কে যেখানে অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়, সেই তুলনায় ট্যাংকারের মাধ্যমে কম খরচে বেশি পরিমাণ পণ্য পরিবহন করা যায়।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য এই প্রণালি অতিক্রম করে, যা বৈশ্বিক সমুদ্রপথে তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ।

এই চালানের প্রায় ৮০ শতাংশের গন্তব্য এশিয়া।

বিশ্বের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশও এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।

এলএনজির ক্ষেত্রে হরমুজের ওপর নির্ভরতা আরও বেশি।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি রপ্তানিকারক কাতার আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে এই রুটের ওপর নির্ভরশীল এবং বর্তমানে তাদের এলএনজি রপ্তানির জন্য বড় আকারের কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেই।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

হরমুজ প্রণালি ইরানকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেয় বলে উপসাগরীয় উৎপাদকরা দীর্ঘদিন ধরে এমন অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করছে, যার মাধ্যমে এই জলপথ ব্যবহার না করেও তেল পরিবহন করা যায়।

এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হচ্ছে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট বা পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন, যা পেট্রোলাইন নামে পরিচিত। এক হাজার ২০০ কিলোমিটার (৭৫০ মাইল) দীর্ঘ এই নেটওয়ার্ক দেশটির পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্রকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু রপ্তানি টার্মিনালের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় এটি নির্মিত হয়, যখন উভয় দেশ উপসাগরে তেলবাহী ট্যাংকার ও অন্যান্য বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালাত।

২০১৯ সালে জরুরি ব্যবহারের জন্য পাইপলাইনটির সক্ষমতা দৈনিক ৭০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করা হয়।

সংযুক্ত আরব আমিরাতও ৪০৬ কিলোমিটার (২৫২ মাইল) দীর্ঘ আবুধাবি ক্রুড অয়েল পাইপলাইন (এডকপ)-এর মাধ্যমে নিজস্ব বিকল্প রুট তৈরি করেছে। এটি আবুধাবির হাবশান তেলক্ষেত্রকে ওমান উপসাগরের ফুজাইরাহ বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করেছে, ফলে রপ্তানি পুরোপুরি হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে যেতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে ফাইন্যানশিয়াল টাইমস বলছে, দুবাইভিত্তিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড ফুজাইরাহতে একটি নতুন বহুমুখী বন্দর এবং বিদ্যমান বন্দরে নতুন টার্মিনাল নির্মাণের বিষয়ে আলোচনা করছে।

এই প্রকল্পগুলোর লক্ষ্য দুবাইয়ের প্রধান কেন্দ্র জেবেল আলির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং হরমুজ প্রণালির বাইরে নৌপথে প্রবেশাধিকার বাড়ানো।

তবে এক্ষেত্রে প্রধান সীমাবদ্ধতা হচ্ছে সক্ষমতা। বিকল্প ব্যবস্থা থাকলেও আইইএ-এর হিসাব অনুযায়ী এগুলো দৈনিক মাত্র ৩৫ লাখ থেকে ৫৫ লাখ ব্যারেল তেল অন্যদিকে সরিয়ে নিতে পারে, যা সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া দৈনিক প্রায় দুই কোটি ব্যারেলের তুলনায় অনেক কম।

কিংস কলেজ লন্ডনের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও মধ্যপ্রাচ্য অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডেভিড বি. রবার্টস সাম্প্রতিক এক প্রবন্ধে লিখেছেন, "এটিও এখনো যথেষ্ট নয়"।

যেসব ক্ষেত্রে বিকল্প পথ রয়েছে, সেখানেও বাস্তব সীমাবদ্ধতা এর কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।

রবার্টসের মতে, ইয়ানবুর লোডিং টার্মিনালগুলো কখনও "এত দ্রুত এত বেশি তেল" পরিচালনার জন্য নকশা করা হয়নি।

দুই রুটই হামলার শিকার হয়েছে।

মার্চ মাসে ইরানের বিরুদ্ধে ফুজাইরাহর স্থাপনায় হামলার অভিযোগ তোলে সংযুক্ত আরব আমিরাত, যে হামলার ফলে সংরক্ষণ ট্যাংকে আগুন লেগে যায় এবং লোডিং কার্যক্রম স্থগিত করতে হয়।

এপ্রিল মাসে পেট্রোলাইনের একটি পাম্পিং স্টেশনে একই ধরনের হামলায় দৈনিক সাত লাখ ব্যারেল পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। যদিও পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকো তিন দিনের মধ্যে পাইপলাইনটি পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনে।

ইরানও হরমুজ এড়িয়ে যাওয়ার নিজস্ব রুট তৈরি করেছে। উপসাগরের মাথায় অবস্থিত গোরেহ থেকে ওমান উপসাগরের জাস্ক রপ্তানি টার্মিনাল পর্যন্ত এক হাজার কিলোমিটার (৬২০ মাইল) দীর্ঘ একটি পাইপলাইন নির্মাণ করেছে।

দৈনিক সর্বোচ্চ ১০ লাখ ব্যারেল পরিবহনের জন্য পরিকল্পিত এই পাইপলাইন ইরানি তেলকে হরমুজ প্রণালি ছাড়াই আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ দেয়।

তবে বাস্তবে নিষেধাজ্ঞা এবং অসম্পূর্ণ টার্মিনাল অবকাঠামোর কারণে এর ব্যবহার পরিকল্পিত সক্ষমতার অনেক নিচে রয়েছে।

হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে নতুন রপ্তানি রুটও বিবেচনা করা হচ্ছে।

এর একটি হলো ৬০০ মাইল (৯৭০ কিলোমিটার) দীর্ঘ কিরকুক-জেইহান পাইপলাইন, যা উত্তর ইরাকের কিরকুক অঞ্চল থেকে তুরস্কের ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর চেইহানে তেল পরিবহন করে।

দুই বছর ছয় মাস বন্ধ থাকার পর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পাইপলাইনটি পুনরায় চালু হয়।

২০২৬ সালের মার্চ নাগাদ এর পরিবহন দৈনিক প্রায় আড়াই লাখ ব্যারেলে পৌঁছায়, যা ইরাককে একটি বিকল্প রপ্তানি পথ দেয়, যদিও দেশের মোট রপ্তানির তুলনায় এটি এখনো কম।

ইরাক প্রতিদিন প্রায় ৩৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করে, যার প্রায় ৯৫ শতাংশ দক্ষিণাঞ্চলের বসরা বন্দর দিয়ে হরমুজ