হুইলচেয়ারে চা-পান বিক্রি করেন আলমগীর
দেবাশীষ ভট্টাচার্য, শেরপুর
আরও পড়ুন
তদন্ত করবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, অভিযানে যাচ্ছে ঔষধ প্রশাসন
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ০৯:০১
এক পা কেটে ফেলা হয়েছে। অন্য পা অচল। বাড়িতে স্ত্রী-সন্তান তিনবেলা পেট ভরে খেতে পায় না। তবুও কারও কাছে হাত পাতেন না আলমগীর। হাতের ওপর ভর করে হুইল চেয়ারে সাজিয়েছেন চা-পানের দোকান। সারাদিন ফেরি করে যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়েই চলে তাঁর সংসার। কারও করুণা না নিয়ে সম্মানজনক জীবিকার পথ বেছে নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এই যুবক।
আলমগীর হোসেন (৩০) শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার কুড়িকাহনিয়া ইউনিয়নের আশ্বিনাকান্দা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি জন্মগত প্রতিবন্ধী নন। কর্মক্ষেত্রে এক দুর্ঘটনায় অঙ্গহানি হয় তাঁর। এরপর থেকেই কঠিন জীবন সংগ্রাম শুরু হয় আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন এই যুবকের।
গত বৃহস্পতিবার রাতে আলমগীরের দেখা মেলে শেরপুর টাউন হলের সামনে। এ সময় দেখা যায়, একটি ব্যাটারিচালিত হুইল চেয়ারে বসে বাড়ি থেকে তৈরি করে আনা চা ফ্লাস্ক থেকে কাপে ঢেলে বিক্রি করছেন। সঙ্গে রয়েছে পান। তাঁর ভ্রাম্যমাণ দোকানে ১০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে এক কাপ লাল চা ও একটি পান। সারাদিন ফেরি করে ৮০০-১০০০ টাকা বিক্রি হয়। এতে তাঁর লাভ হয় ২০০-২৫০ টাকা। এই সামান্য আয় দিয়েই কোনো রকমে চলছে তাঁর সংসার।
কিভাবে পা হারালেন জানতে চাইলে দুর্ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে আপ্লুত হয়ে পড়েন আলমগীর হোসেন। আট বছর আগের সেই ভয়াবহ দিনের কথা মনে পড়লে আঁতকে ওঠেন তিনি। স্ত্রী শাহিনা ও একমাত্র মেয়ে সাদিহাকে নিয়ে সুখের সংসার ছিল আলমগীরের। বিয়ের কয়েকমাস পর একটি কারখানায় চাকরি নিয়ে চট্টগ্রাম চলে যান তিনি। সেখানে প্রায় দুই বছর পুরোনো জাহাজ কাটার কাজ করেন। ২০১৯ সালের একদিনে থমকে যায় তাঁর চলার পথ। গ্যাস কাটার দিয়ে স্টিলের পাত কাটার সময় সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে। ঝলসে যায় তাঁর দুই পা ও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ। পরদিন হাসপাতালে জ্ঞান ফিরলে যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকলেও পা নাড়াতে পারছিলেন না। পরে কারখানার সহকর্মীরা জানান, দুর্ঘটনার পর তাঁর ডান পা কেটে ফেলা হয়েছে। বাম পা পুড়ে অকেজো হয়ে গেছে। তিনি আর কোনো দিন হাঁটাচলা করতে পারবেন না।
আলমগীর হোসেন জানান, কারখানা থেকে তাঁর চিকিৎসা বাবদ ৪-৫ লাখ টাকা খরচ করা হলেও তাঁকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ না দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তখন থেকেই তাঁর এই কষ্টের জীবন।
জেলা প্রশাসক তাঁকে একটি হুইল চেয়ার দিয়েছেন। পরে তিনি ঋণ করে ২৫ হাজার টাকায় ব্যাটারি লাগিয়ে ইজিবাইকের মতো করে নিয়েছেন। তিনি বলেন, কারও কাছে যাতে হাত পাততে না হয় এবং শান্তিতে জীবনটা কাটানো যায় সেই চিন্তা থেকেই এই ব্যবসা বেছে নিয়েছেন। ইচ্ছে করলে ভিক্ষা করে প্রতিদিন ৭০০-৮০০ টাকা রোজগার করা যেত। কিন্তু ভিক্ষুকের কোনো সম্মান নেই। তাঁর ভাষ্য, তিন মাস পর পর আড়াই হাজার টাকা প্রতিবন্ধী ভাতা পান। যা ওষুধ কিনতেই চলে যায়। তাই সরকারি মাসিক চালের কার্ড এবং কিছু মূলধন পেলে ব্যবসা বড় করার স্বপ্ন দেখেন আলমগীর হোসেন।
তাঁর স্ত্রী শাহিনা বলেন, ‘একটা মানুষ যদি দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকে, তখন কারোরই ভালো লাগে না। যেদিন দুর্ঘটনার কথা শুনি, বিশ্বাস করাটাই ছিল আমার জন্য কষ্টকর। কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না।’ তিনি বলেন, ‘ওর (আলমগীর) ইচ্ছা শক্তি প্রবল। মাথা উঁচু করে বাঁচতে চায়। আমিও জীবনের সঙ্গে আপস করি নাই। কষ্টতো হবেই। প্রতিদিন ২০০-২৫০ টাকা আয় হয়। সেই আয়ের ওপর চলার চেষ্টা করি। তবে কষ্ট হয় এই ভেবে যখন দেখি একজন প্রতিবন্ধী মানুষ সরকারি সহযোগিতা পায় না। অথচ বিত্তবানরা চালের কার্ডসহ অনেক কিছু পায়।’
কথা হয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আজকের তারুণ্যের সভাপতি রবিউল ইসলাম রতনের সঙ্গে। তাঁর ভাষ্য, আলমগীরের আত্মসম্মান অন্যদের প্রেরণার প্রতীক হতে পারে। তার মতো যুবক সরকারি অথবা সমাজের বিত্তবানদের সহায়তা পেলে সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখতে পারে।
শ্রীবরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএন) মনীষা আহমেদ জানান, উপজেলা প্রশাসনের তরফ থেকে জীবন সংগ্রামী আলমগীরের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা হবে।
জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁকে হুইল চেয়ার দেওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন তাঁর পাশে থাকবে। বিত্তবানদেরও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।