আমি গ্যারি সোবার্সকে চিনি ওর বয়স যখন ১২, তখন থেকে। বারবাডোজে বড় হচ্ছিল তখন। আমি তখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে নতুন। এর কিছুদিন পরেই ও আমাদের ড্রেসিংরুমে ঢুকে পড়ল, তখন সবে ১৭। ওর কথা মনে আছে, বলছিল, ‘ফিল্ডিং করাটা বরং সহজ, ড্রেসিংরুমে নামজাদা খেলোয়াড়দের পাশে বসে থাকতে বেশি নার্ভাস লাগছে।’তাকে কিছু শেখাতে হয়নি আমাদের। ও নিজেই নিজেকে শিখিয়ে ফেলল। রান করল, উইকেট নিল, ক্যাচ ধরল। ধীরে ধীরে নার্ভাসনেস উধাও হয়ে গেল।একবারই একটা টিপস দিয়েছিলাম ওকে। ইংল্যান্ডে এক ম্যাচে আমি আর সোবার্স একসঙ্গে ব্যাট করছিলাম। তখনকার দ্রুততম পেসার ফ্র্যাঙ্ক টাইসন বল করছিল। গ্যারির ব্যাক লিফট অনেক উঁচু ছিল। আমি বললাম, ‘সাবধান, ও (টাইসন) কিন্তু তোমাকে ইয়র্কারে তুলে নেবে।’হ্যাঁ, সে টিকে গিয়েছিল।

অনেকেই ভাবে, সোবার্স বুঝি সহজাত প্রতিভা, এমনিই খেলে যেতেন, খুব বেশি ভাবতেন না। কিন্তু না, তিনি খুবই চিন্তাশীল খেলোয়াড় ছিলেন।সিডনির মোসম্যান ক্লাব একবার কোচ খুঁজছিল। ক্লাব প্রেসিডেন্ট গ্যারির সঙ্গে ডিনারে গিয়ে বললেন, ‘গ্যারি, আপনাকে কোচ হিসেবে চাই আমরা, কিন্তু আপনার তো কোনো কোয়ালিফিকেশন নেই।’ গ্যারি বলেছিল, ‘তোমার কী মনে হয়, আমি নাইটহুডটা কী কারণে পেয়েছি?’আমার যখন ১৮, ব্যাটিং নিয়ে ওঁর কাছে পরামর্শ চেয়েছিলাম। বললাম, ‘গ্যারি, মনে হচ্ছে কিছু সমস্যা হচ্ছে। কোনো টিপস আছে?’ গ্যারি বললেন, ‘আগে এক বোতল বিয়ার নিয়ে আসো বাবা, তারপর কথা বলি।’তিনি আমাকে তিনটা টিপস দিয়েছিলেন, যেগুলো পুরো ক্যারিয়ারে অনুসরণ করেছি। প্রথমত, মিডল নয়, লেগ স্টাম্প গার্ড নিতে। কারণ, আমি তাঁর মতো ব্যাক অ্যান্ড অ্যাক্রস খেলতাম। দ্বিতীয়ত, ক্রিজ থেকে একটু বাইরে দাঁড়িয়ে ব্যাটিং করতে। তৃতীয়টা মনে নেই এখন, তবে সেটাও খুব কাজে লেগেছিল।আরেকটা দারুণ গল্প বলি। একবার ইংল্যান্ড সফরে জিওফ বয়কট এসে সোবার্সকে বললেন, ‘গ্যারি, তুমি আমাকে বারবার এলবিডব্লু কর, বুঝি না কীভাবে!’ সোবার্স উত্তর দিলেন, ‘অনেকেই ভাবে তোমার টেকনিক ভালো, কিন্তু আমি তা মনে করি না। তোমার সামনের পা বেশি দূর চলে যায় এবং আড়াআড়ি হয়ে যায়। তাই ব্যাট প্যাডের পাশে আনতে পারো না। আমার ইনসুইং তোমাকে এলবিডব্লু করে দেয়।’পরদিন মাঠে দেখা। বয়কট ব্যাটিং করছেন। গ্যারি দৌড়ে এসে প্রথম বলটা করলেন। বাইরের দিকে অ্যাঙ্গেল করা। বয়কট ক্যাচ তুলে দিলেন স্লিপে। বয়কট যখন ফিরে যাচ্ছেন, গ্যারি হেসে বললেন, ‘জিওফ্রে, তুমি কিন্তু আমাকে অন্যটা সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করোনি!’

আজ রাতেই অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছেন নাহিদ, আগে যাচ্ছেন তাসকিনও আরও পড়ুন আজ রাতেই অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছেন নাহিদ, আগে যাচ্ছেন তাসকিনও

মাঠে সোবার্সকে দেখেছি এক অপার বিস্ময় হিসেবে। টেক্সটবুক ছাড়িয়ে কল্পনার ব্যাটিং, বৈচিত্র্যময় বোলিং—পেস, সুইং, স্লো, চায়নাম্যান—আর উইকেটের আশপাশে বিদ্যুৎগতির ফিল্ডিং। ও যেন এক অতুলনীয় জীবনীশক্তি, যার দিকে সব চোখ নিজে থেকেই ঘুরে যেত।কিন্তু আমি তাকে মনে রাখি আরও একটা কারণে—জীবনকে যেভাবে সে উপভোগ করত, তারুণ্যের আগুন তাকে আরও উজ্জ্বল করে তুলত।বৌর্ডায় এক টেস্ট ম্যাচের মাঝরাতে একটা পার্টি। রাত তিনটার দিকে পার্টি শেষ হলো। সবাই হোটেলে ফিরছে। কিন্তু সোবার্স তো চুপচাপ বসে থাকার মানুষ না! কেউ একজন বলল, ‘একটা নতুন জায়গা খুলেছে—দ্য ক্রিমসন ক্যাবেজ।’ সোবার্স সঙ্গে সঙ্গেই বলল, ‘কেউ জায়গার নাম বলবে, আর আমি সেখানে যাব না, এমন হয় নাকি! এখনো সময় আছে, চলো একবার দেখি।’খেলা শুরুর তখনো কিছুটা সময় ছিল। আর জীবনের নেট অনুশীলনও তো গুরুত্বপূর্ণ।কেউ চাইলে দেখে নিতে পারেন, পরদিন মাঠে সোবার্স ঝলমলে এক সেঞ্চুরি করেছিল অফসাইডে, অনসাইডে, মাথার ওপর দিয়ে, এমনকি এই নশ্বর জগতের বাইরেও বাউন্ডারি মেরে।

সাউথ অস্ট্রেলিয়া তখনো শেফিল্ড শিল্ড জেতেনি। টুর্নামেন্টের শেষ ম্যাচের আগে টিম মিটিং। একজন ব্যাটসম্যানকে কীভাবে আউট করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা। হঠাৎ এক কোণ থেকে ভেসে এল ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান কণ্ঠ, ‘ওকে আমার হাতে ছেড়ে দাও।’ এরপরের আলোচনা—ওই বোলারকে কীভাবে খেলব? আবার উত্তর এল, ‘চিন্তা করো না, আমি রান করে দেব।’একজন পেশাদার খেলোয়াড়ের মতোই গ্যারি কথা রেখেছিল—বড় একটা ইনিংস খেলল, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট, আবার কয়েকটা ক্যাচও! ম্যাচ শেষে হাসতে হাসতে বলল, ‘এত চিন্তা কেন তোমাদের, আমার ওপর আস্থা রাখো!’

বিজ্ঞাপন

কাউন্টি ক্রিকেটে সোবার্সের মুখোমুখি হয়েছি অনেকবার। একবার উস্টারশায়ারের বিপক্ষে খেলার সময় সে একটা বল তুলে মারল ডিপ ব্যাকওয়ার্ড স্কয়ার লেগে—সোজা ফিল্ডারের হাতে। সোবার্স যখন ফিরছিল, আমাদের সতীর্থ বাসিল ড’অলিভেইরা বলল, ‘দেখো, ও ফিল্ডারের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নিশ্চয়ই বলবে, আরে তোমাকে তো দেখিইনি!’ পরে আমরা ফিল্ডারকে জিজ্ঞেস করলাম—সে বলল, ঠিক এই কথাটাই বলেছে সোবার্স!নিজের ওপর তার আত্মবিশ্বাস ছিল অসীম। যখন প্রথম ইংল্যান্ডে এসেছিল, থাই প্যাড পরত না, বলত, ‘আরে, ব্যাটটা আছে কিসের জন্য আছে?’ কিন্তু ইংলিশ কন্ডিশনে বারবার থাইয়ে বল লেগে ব্যথা পাওয়ার পর সে প্যাড পরতে শুরু করেছিল।গ্যারির এমন অজস্র কাহিনি আছে। মাঠে যা পারত, মাঠের বাইরেও তাই। শুধু পার্থক্য এই, ও অসাধারণ সব কাজ করে ফেলতে পারত—আমরা পারতাম না।

১৯৬০-৬১ সালের সিরিজে দুজন চমৎকার অধিনায়ক ছিলেন—ফ্র্যাঙ্ক ওরেল ও রিচি বেনো। ক্রিকেট খেলতে চেয়েছিলেন ক্রিকেটের আনন্দেই। সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে ছিলেন রোহান কানহাই, কনরাড হান্ট, ওয়েস হল, ল্যান্স গিবস। কিন্তু যিনি সবাইকে ছাপিয়ে গিয়েছিলেন, তিনি—গারফিল্ড সোবার্স।লোকটা ক্রিকেট মাঠে যা খুশি করতে পারত, শুধু আম্পায়ারিং বাদে। ব্যাটিং? বিধ্বংসী। ফিল্ডিং? অসাধারণ। বোলিং? সব ধরনের! বলার মতো নয়, সে যেভাবে খেলত—দুনিয়ার সেরা বোলারদের ধ্বংস করে দিত। ফিল্ডিং সেট করা যেত না ওর জন্য। যেখানে খুশি, সেখান দিয়েই রান তুলে ফেলত।ব্রিসবেনের সেই ঐতিহাসিক ‘টাই টেস্ট’-এ ও অসাধারণ এক সেঞ্চুরি করল। শট সিলেকশন ছিল এককথায় অবিশ্বাস্য।দ্বিতীয় ইনিংসে আমি একটু অন্য রকম কিছু করার চেষ্টা করলাম। আগের কয়েক ওভারে ধীরে বল করছিলাম, তারপর হঠাৎ একটা জোরালো ইয়র্কার—বল ঢুকে গেল ওর ডিফেন্স ভেঙে। আমি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লাম।  কারণ, ও ছিল সেই ব্যাটসম্যান, বোলাররা যার উইকেট পাওয়ার আশাই করত না। যখন কেউ আপনার সেরা বলটাকেও চার মেরে দেয়, ধরে নিতে