বাংলাদেশে ক্যাশলেস অর্থনীতির যাত্রা নতুন নয়। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, কার্ডভিত্তিক পেমেন্ট আর ডিজিটাল ওয়ালেটের পথ ধরে এবার বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ে এসেছে ‘বাংলা কিউআর’।
এটি মূলত একটি জাতীয় ‘আন্তকার্যক্ষম’ বা ‘ইন্টারঅপারেবল’ পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম, যার মাধ্যমে যেকোনো ব্যাংক, এমএফএস বা পেমেন্ট অ্যাপ ব্যবহারকারী একই কিউআর কোড স্ক্যান করে অর্থ পরিশোধ করতে পারেন।
আরও পড়ুন
চট্টগ্রামের হালিশহরে কারখানায় আগুন
প্রশ্ন হলো, বাংলা কিউআর কি সত্যিই বাংলাদেশকে ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নেবে, নাকি এটি আরেকটি প্রযুক্তিগত উদ্যোগ হয়েই থেকে যাবে?
আগে ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো আলাদা কিউআর কোড ব্যবহার করত। একজন বিকাশ গ্রাহক অনেক সময় ব্যাংকের কিউআরে পেমেন্ট করতে পারতেন না, আবার একটি ব্যাংকের অ্যাপ দিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের কিউআর স্ক্যান করা যেত না।
এই বিভাজন ব্যবসায়ী ও গ্রাহক—উভয়ের জন্যই ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, এমনকি দেশের ক্যাশলেস যাত্রার একটি প্রতিবন্ধকতা হিসেবেও চিহ্নিত হয়েছিল।
বাংলা কিউআর এই সমস্যার সমাধান করেছে। একটি দোকানে একটি কিউআর কোডই এখন যথেষ্ট, যা দেশের যেকোনো ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাপ থেকে ব্যবহার করা যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের জুলাইয়ের শুরুতে প্রায় ৯ লাখ ৬৩ হাজার মার্চেন্ট বাংলা কিউআরের আওতায় এসেছে, যুক্ত হয়েছে ৪৬টি ব্যাংক ও একাধিক এমএফএস-পেমেন্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান।
শুধু গত ৩০ জুন ও ১ জুলাই—এই দুই দিনেই ৭৭ হাজারের বেশি লেনদেনে প্রায় ২২ কোটি টাকা আদান-প্রদান হয়েছে।
সংখ্যাগুলো আশাব্যঞ্জক। কিন্তু একটি প্রযুক্তির সাফল্য কেবল লেনদেনের পরিসংখ্যান দিয়ে নয়, মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাস বদলের সক্ষমতা দিয়েই বিচার করতে হয়।
আর ঠিক এই জায়গাতেই সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় এসেছে, যা নিয়ে এখনই খোলাখুলি আলোচনা দরকার।
১ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট একটি সার্কুলার জারি করে বাংলা কিউআর লেনদেনে ভ্যাটসহ সর্বনিম্ন ১ শতাংশ ‘মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট’ বা এমডিআর নির্ধারণ করেছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, এই ফি গ্রাহকের কাছ থেকে নয়, মার্চেন্টের প্রাপ্য অর্থ থেকেই কেটে রাখা হবে।
অর্থাৎ ১ হাজার টাকার লেনদেনে ক্রেতার হিসাব থেকে পুরো ১ হাজার টাকাই কাটবে, দোকানদার পাবেন প্রায় ৯৯০ টাকা।
সংবাদমাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে যে বিতর্ক দেখা যাচ্ছে, তার কেন্দ্রে মূলত একটি প্রশ্ন—ফি কে দেবে?
কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেয়ে বেশি জরুরি একটি ভিন্ন প্রশ্ন তোলা, তা হলো একটি সদ্যোজাত পেমেন্ট–ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর সময়ই কি তার ওপর অভিন্ন হারে মূল্য আরোপ করা কৌশলগতভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত?
ভারতের ইউপিআই (UPI), থাইল্যান্ডের প্রম্পটপে (PromptPay), সিঙ্গাপুরের পে-নাউ (PayNow), ইন্দোনেশিয়ার কিউআরআইএস (QRIS) এবং মালয়েশিয়ার ডুইটনাউ কিউআর (DuitNow QR)—প্রতিটি সফল ডিজিটাল পেমেন্ট–ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা একই কথা বলে।
ভারতের ইউপিআইয়ে ক্ষুদ্র মার্চেন্টদের জন্য ২ হাজার রুপি পর্যন্ত লেনদেনে এমডিআর একেবারে শূন্য রাখা হয়েছে, উল্টো তাঁদের সরকারি তহবিল থেকে দশমিক ১৫ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হয়।
ইন্দোনেশিয়ার কিউআরআইএসে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য প্রথম তিন বছর হার ছিল শূন্য, ২০২৩ সালে গিয়ে তা মাত্র দশমিক ৩ শতাংশে উন্নীত করা হয়—মাঝারি ও বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য তা এখনো দশমিক ৭ শতাংশ।
মালয়েশিয়ার ডুইটনাউ কিউআরে অধিকাংশ ব্যাংক এখনো স্বেচ্ছায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য এমডিআর সম্পূর্ণ মওকুফ রেখেছে, বড় প্রতিষ্ঠানে তা দশমিক ২৫ থেকে দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে।
থাইল্যান্ডের প্রম্পটপেতে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (BOT) নীতিগতভাবে অনুমোদিত ফি-কাঠামোতে ৫ হাজার বাথ পর্যন্ত লেনদেন সম্পূর্ণ ফি-মুক্ত, ৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার বাথের লেনদেনে ২ বাথের কম, ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ বাথে ৫ বাথের কম এবং তার চেয়ে বড় অঙ্কের লেনদেনে সর্বোচ্চ ১০ বাথ ফি নির্ধারিত আছে।
তবে ২০১৮ সাল থেকে থাইল্যান্ডের অধিকাংশ ব্যাংক মোবাইল পেমেন্টসহ সাধারণ ডিজিটাল লেনদেনের এই ফি স্বেচ্ছায় সম্পূর্ণ মওকুফ করে দিয়েছে।
ফলে দৈনন্দিন কেনাকাটায় ভোক্তা বা ছোট ব্যবসায়ী—কারও কাছ থেকেই বাস্তবে আর কোনো ফি নেওয়া হয় না, প্রম্পটপে কার্যত বিনা মূল্যেই ব্যবহৃত হচ্ছে।
বড় অঙ্কের লেনদেন বা ব্যবসায়িক ব্যবহারে ব্যাংকভেদে সামান্য ব্যতিক্রম থাকতে পারে।
সিঙ্গাপুরের একাধিক ব্যাংক পে-নাউয়ের মাধ্যমে সরাসরি প্রাপ্ত লেনদেনে আগামী কয়েক বছর পর্যন্ত সম্পূর্ণ ফি মওকুফের ঘোষণা দিয়েছে।
অর্থাৎ প্রতিটি সফল দেশ প্রথম কয়েক বছর ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের ফি থেকে সম্পূর্ণ বা প্রায় সম্পূর্ণ ছাড় দিয়ে মানুষের আস্থা তৈরি করেছে, লেনদেনের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হওয়ার পর ধীরে ধীরে টেকসই রাজস্ব কাঠামো গড়ে তুলেছে। খরচ পরে ধাপে ধাপে যৌক্তিক করা হয়েছে, প্রথমেই নয়।
বাংলাদেশেও ১ শতাংশ এমডিআর আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অস্বাভাবিক নয়। চীনে উইচ্যাট পে তার নিজস্ব ঘোষণা অনুযায়ী অধিকাংশ মার্চেন্টের কাছ থেকে দশমিক ৬ শতাংশ কমিশন নেয়, আর আলিপের মার্চেন্ট ফি–ও প্রায় দশমিক ৫৫ শতাংশ—অর্থাৎ এই দুই বৃহৎ প্ল্যাটফর্মের হার বাংলাদেশের ১ শতাংশের কাছাকাছি।
একইভাবে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নির্ধারিত এমডিআরও এই পরিসীমার সমতুল্য।
সমস্যাটা তাই হারের অঙ্কে নয়—বাস্তবায়নের সময় ও ধাপ নিয়ে। বাংলাদেশ বাংলা কিউআর চালুর একেবারে প্রথম পর্যায়েই ছোট-বড় সব মার্চেন্টের জন্য অভিন্ন হার বেঁধে দিয়েছে, প্রকৃত বিতর্কের জায়গাটা তাই এখানেই।
একজন চা-দোকানি বা মুদি ব্যবসায়ীর কাছে ‘৯৯০ টাকা পাবেন’ শোনাটা আর ‘১০ টাকা কমিশন কাটবে’ শোনার অনুভূতি ভিন্ন—যদিও দুটির অর্থ এক। আস্থা তৈরির এই সময়ে ভাষা ও উপস্থাপনার এই সূক্ষ্মতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
এখানে একটি বাস্তবসম্মত প্রস্তাব দেওয়া যায়, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ব্যাংক-এমএফএস এবং ব্যবসায়ী—তিন পক্ষের জন্যই গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
প্রথম ধাপে, চালুর পর পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম ছয় মাস বা এক বছর নির্দিষ্ট লেনদেন-সীমার (যেমন প্রতিদিন ৫০০ টাকা পর্য