যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব ৩০ বছর মেয়াদি একটি পারমাণবিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। এর মাধ্যমে ওয়াশিংটন উপসাগরীয় দেশটিকে পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
গত বুধবার মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট ও সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী আবদুল আজিজ বিন সালমান পারমাণবিক সহযোগিতাবিষয়ক ‘১২৩ চুক্তি’তে সই করেন। এর মধ্য দিয়ে চুক্তিটি চূড়ান্ত অনুমোদন পায়।
আরও পড়ুন
বিশ্বকাপ দেখতে আসা বাংলাদেশিদের ২২% কানাডায় অ্যাসাইলাম চেয়েছেন এখন পর্যন্ত
এ চুক্তি মার্কিন কোম্পানিগুলোকে বিদেশে পারমাণবিক প্রযুক্তি হস্তান্তরের অনুমতি দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু শক্তি আইনের অনুচ্ছেদ ১২৩-এর অধীন মার্কিন সরকার এ ধরনের চুক্তিগুলো করে থাকে।
সৌদি–মার্কিন চুক্তির অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলোর বেশির ভাগই আপাতত অজানা। তবে কিছু বিশ্লেষক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, ইতিমধ্যে অস্থির হয়ে ওঠা মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা রোধ করার মতো পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা এ চুক্তিতে রয়েছে কি না তা নিয়ে।
যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব উভয় দেশই পারমাণবিক অস্ত্রবিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) স্বাক্ষরকারী। তবে পারমাণবিক অস্ত্রবিস্তার রোধে কাজ করা ‘আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা’ (আইএইএ) এই দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে জড়িত ছিল না। তাই এ চুক্তির ক্ষেত্রে সুরক্ষা বিধিনিষেধ কীভাবে প্রয়োগ করা হবে তা অস্পষ্ট। এ ছাড়া সৌদি আরব নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপের (এনএসজি) সদস্য নয়। পারমাণবিক উপাদান ও প্রযুক্তির রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে কাজ করা ৪৮টি দেশের একটি গোষ্ঠী এটি। ফলে দেশটি কীভাবে মূল পারমাণবিক প্রযুক্তি ও ইউরেনিয়াম পাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে এ চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে বিদ্যমান বেশ কয়েকটি পারমাণবিক কর্মসূচির সর্বশেষ সংযোজন মাত্র, যার অনেকগুলোই বেসামরিক। এসব কর্মসূচি সম্পর্কে আর যা জানা যায়:
যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব কিসে সম্মত হয়েছে
চুক্তিতে ঠিক কী রয়েছে তা অস্পষ্ট। তবে একটি দ্বিপক্ষীয় সুরক্ষা চুক্তি হিসেবে এটি আশা করাই যায় যে সৌদির পারমাণবিক কর্মসূচি বেসামরিক চুল্লির চাহিদার সীমার মধ্যে থাকবে। এ ছাড়া এ কর্মসূচি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী বা তার কাছাকাছি স্তরে পৌঁছাবে না। বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে মার্কিন পরিদর্শকদের মাধ্যমে তদারকির একটি প্রক্রিয়া এ চুক্তিতে থাকতে পারে।
বুধবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সাংবাদিকদের বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের এমন কোনো দেশের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে পৌঁছাবে না, যা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি করে।’
ওয়েস্টিংহাউসের মতো পারমাণবিক চুল্লি প্রস্তুতকারক মার্কিন কোম্পানিগুলো এ চুক্তি থেকে লাভবান হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চুক্তিটি এখন পর্যালোচনার জন্য মার্কিন কংগ্রেসে পেশ করা হবে। এটি রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় রাজনৈতিক দলের আইনপ্রণেতাদের কাছ থেকে বিরোধিতার সম্মুখীন হতে পারে। তবে বিরোধিতাকারী আইনপ্রণেতারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হবেন না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে ৯০ দিনের পর্যালোচনার সময়সীমা শেষে চুক্তিটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যাবে।
মধ্যপ্রাচ্যে কোন দেশগুলোর পারমাণবিক কর্মসূচি রয়েছে
২০২৫ সালে ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় এক দিনের বিমান হামলা চালিয়ে দেশটির বিরুদ্ধে ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধে যোগ দেয় যুক্তরাষ্ট্র।
এরপর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ওই দুই মিত্র প্রতিপক্ষ ইরানের বিরুদ্ধে আরেকটা যুদ্ধ শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এর পেছনে অন্যতম কারণ ছিল দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা। তবে তেহরান বারবার জোর দিয়ে বলে এসেছে যে তারা শুধু বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি বজায় রাখছে।
১৯৫৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডুইট ডি আইজেনহাওয়ার ‘শান্তির জন্য পরমাণু’ কর্মসূচি চালু করেন। এটির মূল লক্ষ্য ছিল, পারমাণবিক প্রযুক্তিকে যুদ্ধের বদলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চিকিৎসার মতো ভালো কাজে ব্যবহার করা। এ কর্মসূচির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় ১৯৫৭ সালে ইরান তার প্রথম পারমাণবিক কাজ শুরু করে। আর বিশ্বের কোনো দেশ যেন এ প্রযুক্তি দিয়ে পারমাণবিক বোমা বানাতে না পারে, তার নজরদারি ও তদারকির জন্য ওই বছর আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘আইএইএ’ গঠন করা হয়। ইরান ১৯৭৪ সালে এনপিটিতেও স্বাক্ষর করে।
ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সে সময় জার্মান কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে নির্মিত হয়েছিল। তবে ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে আইএইএ শনাক্ত করে, ইরান পাকিস্তানের সাহায্যে নাতাঞ্জ, ইস্পাহান, ফোর্দোয় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। ফলে তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাজ করছে বলে অভিযোগ ওঠে।
এমন প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কয়েক বছর ধরে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পাশাপাশি সাইবার হামলা চালানো এবং পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের হত্যার মাধ্যমে ইরানকে লক্ষ্যবস্তু বানায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
২০০৩ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধের প্রথম দিন মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত) ফতোয়া জারি করে ঘোষণা করেন যে তাঁর দেশ পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ করবে না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মেয়াদে ২০১৫ সালে ইরান ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ)’ নামে একটি পারমাণবিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। চুক্তিতে তেহরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ মাত্র ৩ শতাংশের কিছু বেশিতে সীমিত রাখতে সম্মত হয়, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী চুল্লির জন্য যথেষ্ট; কিন্তু পরমাণু অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক কম।
ইরান আইএইএকে তার পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতেও অভূতপূর্বভাবে প্রবেশের অনুমতি দেয়। এটি আজ পর্যন্ত কোনো দেশে আইএইএর পাওয়া সবচেয়ে নিবিড় তদারকি সুবিধা বলে মনে করা হয়। আইএইএ এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বারবার এ সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, ইরান চুক্তি মানছে এবং কম মাত্রার সমৃদ্ধকরণ বজায় রেখে চলেছে।
কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে ২০১৮ সালে দাবি করেন যে চুক্তিটি অস্পষ্ট এবং এটি ইসরায়েলের জন্য হুমকি তৈরি করছে। এ অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র ওই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসে এবং ইরানের ওপর আব