আমরা কখনোই লিওনেল মেসিকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বলি না। শুধু মেসির ক্ষেত্রেই নয়, বাংলা পরগনার পরিপ্রেক্ষিতেও হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি কিংবা এ ধরনের যেকোনো চূড়ান্ত তকমার প্রতিও আমাদের আপত্তি আছে। কারণ, একজন মানুষকে যখন আপনি সর্বকালের সর্বোচ্চ আসনে বসিয়ে দেন, তখন অজান্তেই তাঁর শিক্ষক, গুরু, মেন্টর, আইডল, পিতা-মাতা, স্বজন, এমনকি তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের স্বতন্ত্র মহিমাকেও তুলনার খাঁচায় বন্দী করে ফেলেন। অথচ প্রতিটি মানুষই তাঁর নিজস্ব কর্ম ও মানবিক দীপ্তিতে অনন্য। সেই অনন্যতাকে তাঁর নিজস্ব আসনেই সম্মান জানানো শ্রেয়। ঈশ্বরের পৃথিবীতে একজন ব্যক্তিমানুষের জীবনে কত কত মানুষ আর প্রাণ-প্রকৃতির ভূমিকা—কোনটার অবদান সে অস্বীকার করবে?
লিওনেল মেসি কি কোনো দিন নিজ মুখে বলবেন, তিনি পেলে কিংবা ম্যারাডোনার চেয়ে শ্রেষ্ঠ? কখনোই না। বরং আমরা নিশ্চিত, নিজের আট বছর বয়সী কনিষ্ঠ সন্তান সিরোর সঙ্গেও তিনি শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতায় নামবেন না। তিনি বলবেন, সিরো আমার জান, সিরো আমার প্রাণ, সিরো আমার নিশ্বাস। যে মানুষ ভালোবাসাকে তুলনার ঊর্ধ্বে রাখেন, তাঁকে আবার ‘সর্বকালের শ্রেষ্ঠ’ নামের গালভরা অভিধায় মাপার প্রয়োজনই–বা কী?
আরও পড়ুন
একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন
মেসির অর্জনই তাঁর ভাষা। তাঁর ট্রফি, তাঁর গোল, তাঁর অ্যাসিস্ট, তাঁর নেতৃত্ব, তাঁর নীরবতা—সবই তাঁর হয়ে কথা বলে। তিনি বহুবার বলেছেন, রোনালদো নাজারিওদের মতো কিংবদন্তিদের খেলা দেখার সৌভাগ্য তাঁর হয়েছে। কিন্তু কখনো কি বলেছেন, ‘আমি রোনালদোর চেয়েও বড়?’ না, বলেননি। কারণ, প্রকৃত মহত্ত্ব নিজের উচ্চতা ঘোষণা করে না; অন্যের মহিমাকেও সমান শ্রদ্ধায় স্বীকার করতে জানে।
আমাদের বিশ্বাস, কেউ কারও চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়; প্রত্যেকেই নিজের আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো তাঁর অধ্যবসায় ও মানসিক শক্তির প্রতীক। নেইমার তাঁর শিল্পিত ফুটবল দিয়ে কোটি মানুষকে আনন্দ দিয়েছেন। রোনালদিনহোর হাসিমাখা জাদু আর সেই বেঁকে যাওয়া শট এখনো স্মৃতিতে জীবন্ত। এমবাপ্পে নিজের প্রজন্মের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে এগিয়ে চলেছেন। আর মেসি? তিনি ফুটবলকে শিল্পে রূপ দিয়েছেন, বিনয় তাঁকে আরও মহিমান্বিত করেছেন।
সবশেষ ম্যাচে মেসি নিজের দেশ, সতীর্থ, সমর্থক, পরিবার ও নিজের জন্য যে কীর্তি গড়েছেন, তা নিঃসন্দেহে অসাধারণ। যদি তিনি টানা দ্বিতীয়বার দলকে বিশ্বকাপ জয়ের মহিমায় পৌঁছে দিতে পারেন, সেটি হবে ফুটবল ইতিহাসের আরেকটি অবিস্মরণীয় অধ্যায়। তবে সেই সাফল্যও হবে একটি দলের, একটি পরিবারের, একটি ঐক্যবদ্ধ স্বপ্নের—শুধু একজন মানুষের নয়। কারণ, মেসি কখনোই আত্মকেন্দ্রিক নন। তিনি দলকে পরিবার মনে করেন, আর সতীর্থরাও তাঁকে শুধু অধিনায়ক নয় একজন বড় ভাই, একজন পথপ্রদর্শক, একজন মেন্টর হিসেবে দেখেন।
তাই এমন একজন মানুষকে একা করে দিয়ে ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ’ নামের সিংহাসনে বসাতে আমরা দ্বিধাবোধ করি। মেসির সুকৃতিই তাঁর হয়ে কথা বলুক। সময় ও ইতিহাসই তাঁর বন্দনা করুক। আলাদা কোনো তকমা তাঁর প্রয়োজন নেই। তিনি ফুটবলকে যা দিয়েছেন, ফুটবলও তাঁকে ঠিক ততটাই ফিরিয়ে দিয়েছে সম্মান, ভালোবাসা, অমরত্ব। জীবনে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী-ই বা হতে পারে?
আমাদের প্রার্থনা, পৃথিবীর সব সুন্দর মানুষ, সব নির্মল প্রতিভা, সব বিনয়ী মহত্ত্ব মেসির মতো কৃতীদের বাগানে চিরকাল ফুল হয়ে ফুটে থাকুক। আর আমরা শিখি, শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরিয়ে নয়; প্রত্যেককে তাঁর নিজস্ব মহিমায় সম্মান জানিয়েই সর্বমানুষকে নিরঙ্কুশ ভালোবাসতে।
আমরা নিশ্চিত প্রাচ্যকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতাঞ্জলিতেই বরাবর মুগ্ধ হবেন ফুটবল ফেনোমেনন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি কুচ্চিত্তিনি—
ভয় হয় পাছে তব নামে আমি আমারে করি প্রচার হে॥
মোহবশে পাছে ঘিরে আমায় তব নামগান-অহঙ্কার হে॥
তোমার কাছে কিছু নাহি তো লুকানো,
অন্তরের কথা তুমি সব জানো—
আমি কত দীন, আমি কত হীন, কেহ নাহি জানে আর হে॥