আমিনুল ইসলাম খান রানা, সিরাজগঞ্জ

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২৬

তদন্ত করবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, অভিযানে যাচ্ছে ঔষধ প্রশাসন আরও পড়ুন তদন্ত করবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, অভিযানে যাচ্ছে ঔষধ প্রশাসন

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিবছরের জুন মাসের মধ্যেই মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ কনডেম (বাতিল) করে ধ্বংস করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রায় দুই বছর ধরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মেয়াদোত্তীর্ণ সরকারি ওষুধ স্টোরে সংরক্ষণ করে রাখার অভিযোগ উঠেছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অপারেশনে ব্যবহৃত মেয়াদোত্তীর্ণ পোভিডন-আয়োডিন (ভায়োডিন) ও ডিস্টিল্ড ওয়াটার মেয়াদ থাকা ওষুধের সঙ্গে একই স্টোরে রাখা হয়েছে। এতে সরকারি ওষুধের চরম অব্যবস্থাপনার অভিযোগের পাশাপাশি রোগীর নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

৮ জুলাই সকালে স্থানীয় একটি সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে গণমাধ্যমকর্মীরা হাসপাতালের ওষুধের স্টোর পরিদর্শনে গেলে প্রথমে স্টোরকিপার ইসমাইল হোসেন স্টোরে কোনো মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ নেই বলে দাবি করেন। তবে স্টোর ঘুরে দেখা যায়, অপারেশনে ব্যবহৃত উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পোভিডন-আয়োডিন ও ডিস্টিল্ড ওয়াটার অ্যাম্পুলের মেয়াদ ২০২৪ সালেই শেষ হয়েছে। সাংবাদিকদের সামনে বিষয়টি স্পষ্ট হলে তিনি আগের বক্তব্য থেকে সরে আসেন।

বিজ্ঞাপন

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট এবং অপারেশন থিয়েটারের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় এসব ওষুধ ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবহার না হলেও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ আলাদা করে সংরক্ষণ এবং নির্ধারিত সময়ে কনডেম বোর্ডের মাধ্যমে ধ্বংস করা বাধ্যতামূলক। সেই বিধান অনুসরণ না করায় সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘আমি ২০২৫ সালে এখানে যোগদানের আগেই ওষুধগুলোর মেয়াদ শেষ হয়েছে। চিকিৎসক সংকট, অপারেশন থিয়েটারে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব এবং দীর্ঘদিন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সেগুলো ব্যবহার করা যায়নি। বিষয়টি আমার নজরে আসেনি। গণমাধ্যম থেকে জানার পর দ্রুত কনডেম বোর্ড গঠন করে ওষুধগুলো ধ্বংসের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

সিভিল সার্জন ডা. নুরুল আমিন বলেন, ‘সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিবছর মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিনষ্ট করতে হয়। রায়গঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কেন এতদিন তা করা হয়নি, বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল খালেক পাটোয়ারী বলেন, ‘বিষয়টি জেনেছি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সেবা ও নিরাপত্তা নিয়েও অভিযোগ

স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ নয়; হাসপাতালের ওষুধ সংরক্ষণ ও স্টোর ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত তদারকিতেও ঘাটতি রয়েছে। তাদের দাবি, ওষুধ ব্যবস্থাপনার ঘটনায় দায় নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি জেলার সব সরকারি হাসপাতালে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সংরক্ষণ, অপসারণ ও ধ্বংসের প্রক্রিয়া নিয়মিত মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হোক। 

হাসপাতালের সার্বিক সেবার মান নিয়েও দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। অভিযোগ রয়েছে, পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়মিত দায়িত্ব পালন না করায় অনেক সময় রোগীর স্বজনদের দিয়েই হাসপাতালের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করানো হয়। সন্ধ্যার পর হাসপাতাল চত্বরে মাদকসেবী ও বখাটেদের আনাগোনা দেখা যায়। অধিকাংশ সিসিটিভি ক্যামেরা দীর্ঘদিন বিকল থাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি হাসপাতালের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যদের সঙ্গে কয়েকজন মাদকসেবী ও বখাটে যুবকের বাগ্‌বিতণ্ডা ও লাঞ্ছনার ঘটনায় গত ৬ জুলাই রায়গঞ্জ থানায় মামলা হয়েছে।

রায়গঞ্জ থানার ওসি মো. আহসানুজ্জামান বলেন, ‘আনসার সদস্যদের সঙ্গে বখাটেদের দুর্ব্যবহারের ঘটনায় মামলা হয়েছে। এখনও কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। হাসপাতাল এলাকায় পুলিশ নজরদারি অব্যাহত রেখেছে।’

জেলা স্বাস্থ্য রক্ষা সংগ্রাম কমিটির নেতা কমরেড নবকুমার ও পরিবেশবাদী নেতা দীপক কুমার কর বলেন, সরকারি হাসপাতালে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ যথাসময়ে অপসারণ না করা শুধু প্রশাসনিক অবহেলার বিষয় নয়; এটি ওষুধ ব্যবস্থাপনার দুর্বল তদারকিরও প্রমাণ। তাদের মতে, দায় নির্ধারণের পাশাপাশি জেলার সব সরকারি হাসপাতালে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সংরক্ষণ, অপসারণ ও ধ্বংসের প্রক্রিয়া নিয়মিত তদারকির আওতায় আনা জরুরি।