জোসেফ মেরি প্লাঙ্কেট ছিলেন একজন আইরিশ বিপ্লবী, কবি ও জাতীয়তাবাদী। তাঁর জীবনকাল ছিল ১৮৮৭ থেকে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত। তিনি আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। ১৯১৬ সালের ইস্টার বিদ্রোহের (ইস্টার রাইজিং) অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী। সেই সঙ্গে তিনি আইরিশ সাহিত্যজগতের এক গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর। তাঁর সংক্ষিপ্ত; কিন্তু তীব্র জীবনে স্বদেশপ্রেম, আধ্যাত্মিক দর্শন এবং কবিতার জন্য তিনি আইরিশ ইতিহাস ও সাহিত্যে স্মরণীয় হয়ে আছেন।
জোসেফ মেরি প্লাঙ্কেট ১৮৮৭ সালের ২১ নভেম্বর ডাবলিনের এক ধনী ও সংস্কৃতিমান ক্যাথলিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা জর্জ নোবেল প্লাঙ্কেট একজন আভিজাত্যবোধসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি পরবর্তী সময়ে আইরিশ স্বাধীনতা আন্দোলনে সমর্থন দেন। প্লাঙ্কেটের মা জোসেফাইন ক্র্যানি ছিলেন একজন গভীর ধর্মপ্রাণ মহিলা, যাঁর প্রভাব প্লাঙ্কেটের আধ্যাত্মিক চিন্তায় দেখা যায়।
আরও পড়ুন
শিল্প, জলবায়ু ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তিকে একসূত্রে আনল ‘দ্য তত্ত্বমসি সার্কেল’
ছোটবেলা থেকেই জোসেফ অসুস্থ ছিলেন। বিশেষ করে টিউবারকিউলোসিসে (যক্ষ্মা) আক্রান্ত হওয়ায় তাঁর পড়াশোনা বাধাগ্রস্ত হয়। অসুস্থতার কারণে ঘরের মধ্যে অনেক সময় একা কাটাতেন। সেই সময়েই তিনি বই পড়া, লেখালেখি ও আত্মজিজ্ঞাসার চর্চায় মনোনিবেশ করেন। তবে অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি লন্ডনের স্টোনিহার্স্ট কলেজ এবং পরে ইউনিভার্সিটি কলেজ ডাবলিনে পড়াশোনা করেন। সাহিত্য ও কবিতা ছাড়াও তিনি বিজ্ঞান, কৃষি ও দর্শন নিয়েও গভীরভাবে আগ্রহী ছিলেন।
প্লাঙ্কেটের রাজনৈতিক চেতনা ধীরে ধীরে বিকশিত হয়। তিনি ছিলেন একজন আইরিশ জাতীয়তাবাদী। তিনি আইরিশ সংস্কৃতি, ভাষা ও ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবনের জন্য কাজ করতেন। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ছিল আইরিশ প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা, যা ব্রিটিশ শাসন থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হবে। তিনি আইরিশ ভলান্টিয়ার্স ও আইরিশ রিপাবলিকান ব্রাদারহুডের (আইআরবি) সদস্য হন। ১৯১৫ সালে তিনি জার্মানিতে গিয়ে রজার কেসমেন্টের সঙ্গে আইরিশ স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা করেন, যদিও এ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
ইস্টার বিদ্রোহ ছিল ১৯১৬ সালের ২৪ এপ্রিল থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত সংঘটিত একটি সশস্ত্র বিপ্লব, যার মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আইরিশ প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়। এটি মূলত ডাবলিন শহরে সংঘটিত হলেও আয়ারল্যান্ডজুড়ে এর প্রভাব পড়ে। এই সময় জোসেফ মেরি প্লাঙ্কেট একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি এই বিদ্রোহের একজন প্রধান নেতা ও সামরিক পরিকল্পনাকারী ছিলেন। তিনি জেমস কনোলি ও প্যাট্রিক পিয়ার্সের মতো নেতাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন। অসুস্থ শরীরে তিনি ডাবলিনের জেনারেল পোস্ট অফিসে বিদ্রোহীদের নেতৃত্ব দেন।
বিদ্রোহ ব্যর্থ হলে মেরি প্লাঙ্কেটকে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁর জীবনে এক করুণ অধ্যায়ের সূচনা হয়। মৃত্যুর ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি তাঁর বাগদত্তা গ্রেস গিফোর্ডকে বিয়ে করার অনুমতি পান। ১৯১৬ সালের ৪ মে প্লাঙ্কেটকে ফাঁসি দেওয়া হয়। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে কারাগারে তাঁদের বিবাহ সম্পন্ন হয়। এই বিয়ে ও তাঁর আত্মোৎসর্গে এক অদ্ভুত রোমান্টিকতা ও ট্র্যাজেডির মিশেল আছে, যা আইরিশ জাতীয় চেতনাকে আজও আন্দোলিত করে।
প্লাঙ্কেটের প্রেমিকা ও ক্ষণকালীন স্ত্রী গ্রেস ইভলিন গিফোর্ড সম্পর্কে এখানে একটু সংযোজন থাকুক। আয়ারল্যান্ডে তাঁর জন্ম ১৮৮৮ সালে, মৃত্যু ১৯৫৫ সালে। তিনি ছিলেন একজন আইরিশ শিল্পী, কার্টুনিস্ট ও স্বাধীনতাকামী সক্রিয় কর্মী।
গ্রেস ক্যাথলিক ধর্মে দীক্ষিত প্রটেস্ট্যান্ট পরিবারে জন্ম নেওয়া স্বাধীনচেতা নারী। তিনি জোসেফ মেরি প্লাঙ্কেটের প্রেমে পড়েন। তাঁদের সম্পর্ক ছিল গভীর আত্মিক ও রাজনৈতিক স্তরে। তাঁরা বিয়ে করতে চেয়েছিলেন ১৯১৬ সালের গ্রীষ্মে। কিন্তু ইস্টার বিদ্রোহ ব্যর্থ হলে প্লাঙ্কেটকে বন্দী করে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। ৪ মে ১৯১৬ সালে প্লাঙ্কেটের মৃত্যুর দুই ঘণ্টা আগে তাঁকে কারাগারে, একজন প্রিজন চ্যাপলিনের সামনে বিয়ে করেন গ্রেস গিফোর্ড। এটি আয়ারল্যান্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে করুণ; কিন্তু সবচেয়ে গৌরবময় বিয়েগুলোর একটি।
গ্রেস জীবনের বাকিটা সময় প্লাঙ্কেটের স্মৃতি বয়ে বেড়িয়েছেন। তিনি আইরিশ স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় থেকেছেন। ১৯২৩ সালে তিনি রাজবন্দী হিসেবে গ্রেপ্তার হন এবং জেলে ‘দ্য ম্যাডোনা অব দ্য কে’ নামে একটি বিখ্যাত চিত্র আঁকেন।
আয়ারল্যান্ডে গ্রেস গিফোর্ড ও জোসেফ মেরি প্লাঙ্কেটের প্রেম ও আত্মত্যাগকে এক পবিত্র ইতিহাসের অংশ মনে করা হয়। তাঁদের ভালোবাসা ও বিয়ের মুহূর্ত আধুনিক আইরিশ সংস্কৃতিতে গান, নাটক ও চলচ্চিত্রে অমর হয়ে আছে।
ইস্টার বিদ্রোহ ব্যর্থ হয় মাত্র ছয় দিনের মাথায়। প্লাঙ্কেটসহ ১৬ জন নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। শুরুতে জনমত নেতাদের বিপক্ষে থাকলেও তাঁদের আত্মত্যাগই পরবর্তীকালে জাতীয়তাবাদী চেতনার আগুন জ্বালায়। ১৯২১ সালে আইরিশ স্বাধীনতা আন্দোলন সফল হয় তাঁদের আত্মবলিদানের ভিত্তিতেই। ইস্টার বিদ্রোহ ছিল আয়ারল্যান্ডের ২০ শতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা।
জোসেফ মেরি প্লাঙ্কেটের জীবনদর্শন মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমত, ক্যাথলিক মিস্টিসিজম। তিনি বিশ্বাস করতেন যে আত্মার মুক্তি ও ঈশ্বরের সঙ্গে মিলনই মানবজীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। তাঁর কবিতায় খ্রিষ্টের ক্রুশ, পবিত্র আত্মত্যাগ ও ব্যথা উপলব্ধিকে ঘন ঘন দেখা যায়।
জাতীয়তাবাদ ও আত্মোৎসর্গ ছিল প্লাঙ্কেটের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ ভাবাদর্শ। তাঁর মনে বিশ্বাস ছিল, আয়ারল্যান্ডের জন্য জীবন দেওয়া কোনো দুঃখের বিষয় নয়; বরং পবিত্র দায়িত্ব। দেশকে মাতৃমূর্তিতে কল্পনা করে তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেন ‘আয়ারল্যান্ডের জন্য, ঈশ্বরের নামে’।
প্লাঙ্কেটের ভাবুকতার আরেকটি স্তম্ভ হলো প্রেম। তিনি প্রেমকে দেখতেন আত্মার পবিত্রতায় উত্তরণ ঘটানোর একটি মাধ্যম হিসেবে। প্রেম, মৃত্যু ও মুক্তির ধারণা তাঁর লেখায় ও জীবনে একাত্ম হয়ে যায়। জাগতিক প্রেমকে তিনি আধ্যাত্মিক প্রেমের সিঁড়ি হিসেবে বিবেচনা করতেন।
জোসেফ মেরি প্লাঙ্কেট ছিলেন একজন প্রতিভাবান কবি। তাঁর লেখার মধ্যে মিল পাওয়া যায় উইলিয়াম ব্লেক, দান্তে ও খ্রিষ্টীয় সাধুদের মিস্টিক চ