অগ্নিলাকে হাইওয়েতে উঠতে মানা করলাম। সে শুনলো না। প্রচণ্ড বৃষ্টি ঘনঘটা করে আসবে আসবে করছে। টরন্টোর এই এক বজ্জাত হাইওয়ে সাউথ থেকে নর্থে যার নাম ডনভ্যালি। এতবড় শহর টরন্টো অথচ এই একটাই হাইওয়ে নর্থে যাওয়ার। আমরা অবশ্য কিছুটা গিয়ে ইস্টে যেতে পূর্ব পশ্চিমে হাইওয়ে ফোর ও ওয়ান ইস্ট ধরবো। প্রবাসে সুযোগই হয় না এমনটা যে কেউ গাড়ি চালাবে আমি পাশে বসে আশপাশের গতিময় সরে যাওয়ার দৃশ্য দেখবো। যে যার গাড়ি চালাতেই অভ্যস্ত। আজ চোখের ছানি পড়েছে, বলছেন ডাক্তার সহসা তা কেটে ফেলে লেন্স বসিয়ে দিতে হবে। আজ সেই চোখের আল্টাসনো করে কী সব মাপটাপ নেওয়ার কথা। চোখ পরীক্ষা করার আগে কেমন যেন এক প্রকার ড্রপ দিয়ে নেওয়া হয়; যাতে চোখের ভেতরে কর্নিয়া বড় হয়ে ওঠে, দেখতে ডাক্তারদের সুবিধা হয়। মুশকিলটা হয় যার চোখে এই ড্রপ পড়ে। ঘণ্টা তিনেক কিংবা চারেক দৃষ্টিমান সব ঘোলাটে হয়ে থাকে। রোদে গেলে মনে হয় সূর্য নেমে এসেছে খুব নিচে। ডার্ক কালো সানগ্লাস পরে থাকতে হয়। নিজে গাড়ি চালানো প্রায় অসম্ভব। আজ তাই অনেক কাজ কাটছাঁট করে আমার একমাত্র সন্তান নিজের দুই ছোট মেয়েদের স্কুলে নামিয়ে আমাকে বাসা থেকে নিয়ে চোখের ডাক্তারের কাছে গেলো। ও গাড়ি চালাচ্ছে, আমি পাশে বসেছি, অনেক দিন এমনটা হয় না। আমরা ডন ভ্যালিতে ঢুকতেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছে। তবে ফোর ও ওয়ান ইস্টে বাড়িমুখো হতেই প্রচণ্ড বৃষ্টি। কালো চশমা পরে মেয়ের পাশে বসে আছি। এই প্রচণ্ড বৃষ্টিতেও অগ্নিলা প্রায় একশ দশ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চালাচ্ছে। আমার ভয় হচ্ছে। নিজে চালালে ভয় হতো না। অগ্নিলা খুব ভালো গাড়ি চালায়, আমার মতোই। তবু যারা হরদম গাড়ি চালায় তারা অন্য কেউ ড্রাইভিং করলে পাশে বসলে খুব অস্বস্তিতে থাকে। ওতো আমার মেয়ে। ওর শৈশবে ঢাকায় সেই গ্রিনরোড বাসা থেকে মোহাম্মদপুর গ্রিনহ্যারল্ড স্কুলে তাকে গাড়িতে নিজে চালিয়ে নিয়ে যেতাম। আজ সে আমাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছ থেকে বাসায় ড্রপ করছে। গাড়ির গতির সঙ্গে বৃষ্টির তীব্রতার যেন পাল্লা চলছে। এমন প্রচণ্ড বৃষ্টি এখানে তেমন হয় না। আজ হচ্ছে। –বাবা ভয় পেয়ো না, আমি ঠিক আছি। তুষার পড়ার সময় গাড়ি চালিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দূরে যাই। এই বৃষ্টি তো এমন কিছুই না! খারাপ লাগছে না এই বয়সে অসুখে-বিসুখের উছিলায় সন্তানকে কাছে পাওয়া। আমি ও স্ত্রী দুজনই থাকি লরেঞ্চ অ্যাভিনিউর পাশে এগারো তলা বাড়ির ৯ তলায়। অগ্নিলা একেবারে প্রধান গেইটের শেডের নিচে নামিয়ে দিল। জিজ্ঞেস করলো বারবার, গাড়ি পার্ক করে ওপরে আমাকে দিয়ে আসবে কিনা। আমি জানি ওর তাড়া আছে। কারও সঙ্গে যেন দেখা করার কথা। এখানে তো সব ঘড়ির কাঁটা মেনে চলে। তাই বললাম–না, না তুমি যাও। আমি ভালোই দেখতে পাচ্ছি এইতো। ঢুকেই এলিভেটর দিয়ে ওপরে উঠে যাবো। বৃষ্টি তখনও থামেনি। অগ্নিলা চলে গেলো। আমি তখনই এলিভেটরে ঢুকলাম না। লবিতে একটি সোফা পাতা আছে, সেটিতে বসলাম। চোখে ঝাপসা দেখায় অর্ধ বন্ধ লাগছে। বৃষ্টির জন্যে মানুষজন নেই। উঠে গিয়ে বাইরে আবার একটু বৃষ্টির ছিটা গায়ে মেখে আসলাম। বসে বসে ভাবতে ইচ্ছে করছে। ভাবলাম একটু বসি একা একা। একই বৃষ্টি দেশেও আসে, কানাডাতেও অথচ অনুভূতি এতোটা আলাদা কেন! আসলে একই বৃষ্টি শুধু আমার দেশে বেড়ে ওঠার নানা স্মৃতিতে মিলেমিশে কত ভাবাবেগ তৈরি করে। শ্রাবণ মেঘের ঘনঘটায় জীবনের কত্ত স্মৃতি হারিয়ে যায় না লুকিয়ে থাকে। কানাডা থেকে আগে দেশে গেলে দু’চার দিন ঢাকায় জিরিয়ে নিয়ে মাকে দেখতে চট্টগ্রাম দৌড় মারতাম। তখনও ঢাকা-চট্টগ্রাম একই রাস্তায় দুই মুখী গাড়ি চলতো। সেকি ভয়াবহ। বাসে-ট্রাকে দুর্ঘটনাও ঘটতো খুব। তাই রাতে ট্রেনে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে খুব ভোরে পৌঁছে যেতাম চট্টগ্রাম। একবার ভোর হয় হয় সময় ট্রেন থেকে চট্টগ্রাম স্টেশনে নেমে বসে আছি। এমন প্রচণ্ড বৃষ্টি বেরোনো মুশকিল। তেমন একটা রিকশা, সিএনজি অটোরিকশাও নেই। আমি স্টেশন থেকে বেরিয়ে প্রথমে তখন বাবার কবরে যেতাম। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে বাবার মুখ ভাবতাম। তারপর ফিরে যেতাম মায়ের কাছে। ঢাকাগামী একটা ট্রেন ছাড়বে ছাড়বে করছে। তাই কিছু মানুষ এই বৃষ্টিতেও দেখা যাচ্ছে স্টেশনে। আমি বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় বেঞ্চে বসে আছি। আমার তাড়া নেই। আমি যে আসবো মাকে জানাই নাই। ভেবেছি আচমকা গিয়ে চমকে দেবো। তারপর একসঙ্গে নাস্তা করবো। বৃষ্টির জন্যে সব ওলটপালট হয়ে গেলো। ঢাকাগামী ট্রেন ছেড়ে গেছে। আবার স্টেশন প্রচণ্ড বৃষ্টিতে প্রায় ফাঁকা। মাথা নিচু করে ভাবছিলাম গরম চা পাওয়া গেলে দারুণ হতো। চায়ের জায়গায় শুনলাম নারী কণ্ঠে ডাক। –এমন বৃষ্টিতে এই ফাঁকা রেলস্টেশনে কানাডিয়ান সাহেব কী করছেন? ভীষণ চমকে তাকালাম। সামনে ডাক্তার তাসনুভা নাজনীন দাঁড়িয়ে। আমার চোখের পলক পড়ে না। এ কী ভাগ্য। আমার প্রাক্তন প্রেমিকা কিংবা ওর প্রাক্তন প্রেমিক। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে পড়তো। অথচ ওর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল ঢাকায়। দিন যেতে যেতে আলাপ বাড়তে বাড়তে পরস্পর একটু ভালোলাগা বাড়ছিল। খুব চিঠি লিখতাম। আমার চিঠিরই প্রেমে পড়ে গিয়েছিল মনে হয়। প্রায় বাসে করে তখন চলে আসতাম। চট্টগ্রাম তো আমারই শহর। চট্টগ্রাম মেডিকেলে মেয়েদের হোস্টেলের সামনের পাহাড় কাটা রাস্তার নাম ছাত্রছাত্রীরা দিয়ে ছিল ‘লাভ লেইন’। জোড়ায় জোড়ায় সব প্রেমিক-প্রেমিকা সেখানে রাত-বিরাতেও বসে কথা বলতো। তাসনুভার সঙ্গে সম্পর্কটা আমার খুবি ক্যাজুয়াল ছিল। কথা বলতে ভালো লাগে, দেখা হলে ভালো লাগে। তবে ওই লাগতে লাগতে সব বাড়ে। আসলে তাসনুভার সঙ্গে ঘণ্টাকে ঘণ্টা কথা বলতে ইচ্ছে করত। রেস্টুরেন্টে ভালো কিছু আমাকে খাওয়াতে পছন্দ করতো। আমি বারবার বলতাম বন্ধু হয়ে থেকো তাও অনেক। সে প্রথমেই বলেছিল বাবার আর্মি বন্ধুর আর্মি ছেলের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। আমার সেটি মাথায় রেখে অতটা ঘনিষ্ঠ হওয়া উচিত ছিল না। তবে এই ভালোলাগা-টাগা ঠিক হিসেব করে তো আর হয় না। মনকে বলে রেখে ছিলাম এক সুন্দর সময়ে ইউটার্ন নিয়ে উল্টোপথে যেতে হবে। আবার মনে হতো তাহলে সেটি এখনই করা ভালো। কি দরকার ইমোশনাল প্যাঁচ আরও পাকানোর। দুই পক্ষ কিছু দিন নিশ্চুপ থেকে চেষ্টা করাও হয়েছিল। বেশি দিন সম্ভব হয়ে ওঠে না! হয় ও ফোন করে মৌনতা ভাঙে, না হয় আমি ভাঙি। পরস্পরের জন্যে ছটফট করি। কী ভাবে যেন তানুভার বড় ভাই সেও আর্মি। আমাদের ব্যাপারটা জেনে ঢাকায় আমাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে ধানমন্ডি লেকের নিরিবিলিতে বোঝালেন। মেরে দূরে কোথাও ফেলে দিলে কে কী করবে! কিছু করার ক্ষমতা আছে? –না, নেই! –তাহলে, বোন থেকে দূরে। তোমার ভাগ্য ভালো আমি জেনে তোমার সঙ্গে দেখা করলাম। ওর হবু স্বামী যদি জানতো তাহলে এতদিন বধ্যভূমিতে পাছা উল্টে পড়ে থাকতে। তারপর স্বাভাবিক ভাবে দি এন্ড। তাসনুভার রুমমেইট একটা চিঠি পৌঁছে দিয়ে ছিল লেখা শুধু–সরি, গুডবাই। এরপর কী হয়েছে জানি না। এতবেশি ভাবাবেগে না ভুগে নিজের মতো এগিয়ে নিয়েছি জীবন। পরে শুনেছি তার বিয়ে হয়েছে, কালক্রমে দুটি সন্তানও হয়েছে। চট্টগ্রামেই বসবাস। সেই তাসনুভা– এই প্রচণ্ড বৃষ্টির সকালে প্রায় ফাঁকা স্টেশনে সামনে দাঁড়িয়ে আমার কথা বন্ধ হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। বেশিক্ষণ লাগলো না দুইজনই স্বাভাবিক হলাম। সে জানালো স্বামী ট্রেনে ঢাকা গেছে, তাকে সিঅফ করতে নিজেই গাড়ি চালিয়ে এসেছে। ফাঁকা বেশ, তাই চোখ পড়েছে আমার মাথা গুজে বসে থাকা। –তোমার কি এখনি বাড়িতে মায়ের কাছে না গেলে সমস্যা হবে? –আমি যে আসছি মাকে জানাই নাই! –বাহ, তাহলে আমি বলে দিই, বাসায় অন্য জিপ আছে, অফিসের আর্মি ড্রাইভার আছে, বাসায় কাজের অনেক লোকজন আছে। আমার প্রায় চট্টগ্রাম হাসপাতালে লম্বা সময় থাকতে হয়। ওদের বলে দেব, আজ আমার জটিল কাজ পড়ে গেছে। – চলো এই প্রচণ্ড বৃষ্টিতে প্রথমে কোথাও ভালো রেস্টুরেন্টে নাস্তা খাই। তারপর লং ড্রাইভে বান্দরবান যাই। শহর থেকে বেশ দূরে একটা পাহাড়ি রেস্টুরেন্ট আছে। ভালো দামি লোকেরা তেমন যায় না। খাওয়া খুবই ভালো। সেখানে গিয়ে লাঞ্চ করে ফিরে আসবো। তোমাকে তোমার বাড়িতে নামিয়ে দেবো। মাকে বলো এইতো সন্ধ্যায় এসেছি। প্রচণ্ড বৃষ্টিতে পাহাড়ি পথে কী চমৎকার গাড়ি চালায় তাসনুভা। গাড়ির জানালার কাচ কিছুটা নামাতে বৃষ্টির পানি চোখেমুখে লাগছিল। –ভিজতে যেও না! কাপড় ভিজে গেলে শুকানো মুশকিল। তাছাড়া সাহেবের দেশ থেকে এসেছো, জ্বর-টরও এসে যেতে পারে। –জ্বর এলে তো ভালোই। সাথে ডাক্তার আছেন। একটু তো সেবা দেবেন। এতো কথা দু’জনে বললাম। টন কে টন কথাই কথা। সন্ধ্যার পরপর ফিরে এলাম আমরা। আমার বাড়ির সামনে নামিয়ে দিতে আমি নেমে ঘুরে ওর ড্রাইভিং সিটের দিকে গেলাম। –আমার শেষ চিঠি ‘গুড বাই’ কি রেখেছো যত্ন করে? – না। – উফ্! এতো নিষ্ঠুরতার কী আছে! ইমোশনাল ভাবেও তো মানুষ কত কিছু রাখে। – এসব রাখলে বিপদ, শুধু কামড়াতে আসে। তাসনুভার সেই ভুবন ভাসানো হাসি প্রায় একই রকম আছে। – উফ্ তুমি কথাতো গাড়িতে বসেও বলতে পারতে। বাইরে দাঁড়িয়ে একেবারে ভিজে গেলেতো। – আজ অনেকদিন পর পরবাস থেকে এসে নিজের জন্মভূমি চট্টগ্রামে ভিজতে ইচ্ছে করছে। এই অবস্থা দেখে মা খুব বকা দেবেন। ঠিক ছোটবেলার মতো! সেটাওতো এক বড় পাওয়া হবে। –জানো আমার সব আছে, এতো কিছু তবু খুব বোর হয়ে যাই জীবনের ওপর। মনে হয় এতো প্রাচুর্যে চাপা পড়া এটা একটা জীবন হলো! মনে হয় জীবনে ভুল করেছি। তোমার সঙ্গে চলে গিয়ে হালকা পাতলা একটা মজার জীবন পেলেই হয়তো খুব সুখী হতাম। – ভুল! তখনো বলতে আমি কিভাবে এতো বড় ভুল করলাম। এমন প্রতিপত্তি প্রাচুর্য আর্মি ক্ষমতার স্বামী ছেড়ে এক উড়ন চন্ডিকে বিয়ে করে এতো বড় ভুল কীভাবে করলাম। তাসনুভার চোখ চিকচিক করছে। রেগে সে দুইবার গাড়ির হর্ন বাজালো। তারপর চলে গেলো। পরবাসে কই পাবো এমন শ্রাবণস্মৃতি?
নিরিবিলি শ্রাবণগাথা
অগ্নিলাকে হাইওয়েতে উঠতে মানা করলাম। সে শুনলো না। প্রচণ্ড বৃষ্টি ঘনঘটা করে আসবে আসবে করছে। টরন্টোর এই এক বজ্জাত হাইওয়ে সাউথ থেকে নর্থে যার নাম ডনভ্যালি। এতবড় শহর টরন্টো অথচ এই একটাই হাইওয়ে নর্থে যাওয়ার। আমরা অবশ্য কিছুটা গিয়ে ইস্টে যেতে পূর্ব পশ্চিমে হাইওয়ে ফোর ও ওয়ান ইস্ট ধরবো। প্রবাসে সুযোগই হয় না
আরও পড়ুন
সর্বশেষ সংবাদ
সব দেখুন ›
চট্টগ্রামের হালিশহরে কারখানায় আগুন
২৭ জুলাই ২০২৬
একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন
২৭ জুলাই ২০২৬
৩০ জুলাই খোলা থাকছে সিএনজি ফিলিং স্টেশন
২৭ জুলাই ২০২৬
মন্তব্য (0)
মন্তব্য করুন
এখনো কোনো মন্তব্য হয়নি। প্রথম মন্তব্য করুন!