বন সুরক্ষার জন্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সম্পদ প্রয়োজন। কিন্তু তাদের ভূমির আনুষ্ঠানিক অধিকার না থাকলে, বন সুরক্ষার বৈশ্বিক তহবিল এসব জনগোষ্ঠী পাবে না। পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি বিরোধ, জলবায়ু পরিবর্তন ও বন সুরক্ষার বাধা—এসবের আন্তসম্পর্ক নিয়ে লিখেছেন খলিলউল্লাহ্
পরিবেশ বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পৃথিবীর ভয়ানক বিপদ সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। এর মোকাবিলায় বনের সুরক্ষাও যে জরুরি, সে কথাও সবার জানা। কিন্তু এ লক্ষ্যে আন্তরিক কাজ খুব কমই হয়। যেটুকু হয়, তার বেশির ভাগই নানা ধরনের এনজিওভিত্তিক কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
আরও পড়ুন
বিশ্বকাপ দেখতে আসা বাংলাদেশিদের ২২% কানাডায় অ্যাসাইলাম চেয়েছেন এখন পর্যন্ত
কিন্তু এখনো এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা কোনো রকম স্বীকৃতির আশা না করে বনের সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন। আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর এসব মানুষ রাজনীতি আর করপোরেট মুনাফার শিকার হয়ে ওঠা বনজঙ্গলের সুরক্ষায় নীরবে কাজ করে চলেছেন। কিন্তু বনের সুরক্ষায় আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মানুষের ভূমির অধিকারের গুরুত্ব নিয়ে খুব একটা আলোচনা চোখে পড়ে না।
গত ১৪ মে দৈনিক প্রথম আলোয় ‘পাহাড়ে সংরক্ষিত বন উজাড়, অথচ সজীব মৌজা বন’ শিরোনামে একটি বিস্তৃত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে দেখা যায় কীভাবে এসব বন স্থানীয় মানুষের প্রজ্ঞা আর পরিচর্যায় শত শত বছর ধরে টিকে আছে। অন্যদিকে সরকারের অধীনে থাকা সংরক্ষিত ও রক্ষিত বনের অবস্থা বেহাল। তবে এসব মৌজা বনের মালিকানার সঙ্গে বনের কার্যকর সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার সম্পর্ক রয়েছে।
ফ্রন্টিয়ার্স ইন ইকোলজি অ্যান্ড দ্য এনভায়রনমেন্ট জার্নালে প্রকাশিত ‘ইম্পর্ট্যান্স অব ইন্ডিজেনাস পিপলস ল্যান্ডস ফর দ্য কনজারভেশন অব ইন্ট্যাক্ট ফরেস্ট ল্যান্ডস্কেপস’ শিরোনামের এক নিবন্ধে দেখা যায়, আদিবাসী, আফ্রো-বংশোদ্ভূত ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি অক্ষত বনভূমি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে চলেছে। অবাক করা বিষয় হলো, নিউইয়র্কভিত্তিক রেইনফরেস্ট ফাউন্ডেশনের হিসাবে দেখা যায়, এসব এলাকায় বন উজাড়ের হার বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় ২৬ শতাংশ পর্যন্ত কম।
রাইটস অ্যান্ড রিসোর্সেস ইনিশিয়েটিভ ২০২৩ সালে ‘হু ওনস দ্য ওয়ার্ল্ডস ল্যান্ড?’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এ প্রতিবেদনে বিশ্বের ৭৩টি দেশের বন নিয়ে করা বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় ১১ দশমিক ৪ শতাংশ ভূমি ও বনভূমি আনুষ্ঠানিকভাবে এসব জনগোষ্ঠীর নিজেদের বলে স্বীকৃত। কিন্তু তাদের অন্তত ১ দশমিক ৩৭৫ বিলিয়ন হেক্টর ভূমি এখনো বিভিন্ন দেশের সরকার আইনি স্বীকৃতি দেয়নি।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ১৮টি পরীক্ষামূলক গবেষণার একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা করেছে। সেখানে দেখা যায়, আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার প্রদানের ফলে অনেক জায়গায় বন বিনাশ কমেছে। সরকারি বনও এখান থেকে শিক্ষা নিতে পারে। কমিউনিটিকে ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত না করলে বন টিকিয়ে রাখা কঠিন। রাষ্ট্রের পক্ষে সারাক্ষণ নজরদারি সম্ভব নয়। তা ছাড়া দুর্গম এসব এলাকায় চাইলেও রাষ্ট্র খুব বেশি তদারক করতে পারবে না। তাই কমিউনিটির প্রয়োজন। এসব বনের স্বীকৃতি দিলে আন্তর্জাতিক অর্থায়নও পেতে পারে এখানকার জনগোষ্ঠী। ফলে বন সুরক্ষায় তারা আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রশ্ন হলো, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার বা মালিকানা কেন দরকার? বিশিষ্ট ফরাসি সমাজতান্ত্রিক দার্শনিক পিয়েরে–জোসেফ প্রুধনের বরাত দিয়ে যে কেউ বলতে পারে ‘প্রপার্টি ইজ থেফট’। অর্থাৎ মালিকানা বিষয়টাই আসলে চৌর্যবৃত্তি। ১৮৪০ সালে প্রুধন তাঁর হোয়াট ইজ প্রপার্টি গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলেছেন। কারও নির্দিষ্ট মালিকানা আরোপ করা মানেই সেটা কোনো না কোনোভাবে অন্যকে বঞ্চিত করে দখল করা হয়েছে।
তবে দার্শনিক কার্ল মার্ক্স আবার ১৮৪৭ সালে পভার্টি অব ফিলোসফি গ্রন্থে প্রুধনের এ ধারণার সমালোচনা করেছেন। মার্ক্সের কথা হলো সম্পত্তি চুরি করতে হলে সম্পত্তির অস্তিত্ব তো আগে স্বীকার করতে হবে। তার মানে যে সম্পত্তির সমালোচনা আপনি করছেন, তার নিয়মই আপনি অনুসরণ করছেন।
কার্ল মার্ক্স এটাকে চুরি না বলে বরং উৎপাদনের উপকরণের ব্যক্তিগত মালিকানা বাতিল করার কথা বলেছেন। অর্থাৎ তিনি আসলে কমিউনিটির ধারণার কথাই বলেছিলেন, যেটা আমাদের পাহাড়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠী চর্চা করে আসছে বহুকাল ধরে। তারা মৌজা বনগুলোর ব্যবস্থাপনাও করছে সে নিয়মেই। কিন্তু আমরা এখন যে সমাজে বসবাস করি, সেখানে মালিকানার ধারণা সুপ্রতিষ্ঠিত। তাই স্থানীয় ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমির মালিকানাও জরুরি হয়ে পড়েছে।
এদিকে আনুষ্ঠানিক ভূমির অধিকার ছাড়া এসব জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ জলবায়ু ও বনবিষয়ক আন্তর্জাতিক অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কারণ, এসব অর্থ সাধারণত রাষ্ট্রের কাছে যায়। রাইটস অ্যান্ড রিসোর্সেস ইনিশিয়েটিভ এবং রেইনফরেস্ট ফাউন্ডেশন নরওয়ের ২০২৫ সালের এক যৌথ প্রকাশনায় দেখা যায়, ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলের ১ শতাংশের কম গেছে আদিবাসী ও কমিউনিটির ভূমি মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় যুক্ত কর্মসূচিগুলোতে। আবার এর মাত্র ভগ্নাংশ গেছে সরাসরি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বাধীন সংগঠনগুলোতে।
২০২১ সালে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত কপ২৬–এ ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রতিশ্রুতির মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ গেছে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে। কারণ, এসব তহবিল যায় তাদের কাছেই, যারা আনুষ্ঠানিকভাবে ভূমির মালিক হিসেবে আইনগতভাবে স্বীকৃত। ফলে কার্যকরভাবে বন সুরক্ষার জন্য এসব জনগোষ্ঠীর যথেষ্ট সম্পদ থাকে না।
বন সুরক্ষার জন্য এ ধরনের বৈশ্বিক আরও তহবিল রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ট্রপিক্যাল ফরেস্ট ফরএভার ফ্যাসিলিটি (টিএফএফএফ)। বিশ্বের ৫৩টি দেশ এ উদ্যোগের অনুমোদন দিয়েছে। ১২৫ বিলিয়ন ডলারের এই মিশ্র তহবিল থেকে বনাঞ্চলীয় দেশগুলোকে অর্থায়ন করা হয়। শর্ত হলো অন্তত ২০ শতাংশ অর্থ সরাসরি আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে দিতে হবে, যারা নিজেদের ব্যবস্থাপনায় বনের সুরক্ষা নিশ্চিত করছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বনজঙ্গলকে ধরা হয় সবচেয়ে বড় মিত্র হিসেবে। বৈশ্বিক নানা সম্মেলন ও চুক্তিতে ২০৩০ সালের মধ্যে বন বিনাশ বন্ধ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত ৩০তম জলবায়ু সম্ম