সব জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে হৃদ্‌রোগ, উচ্চ রক্তচাপসহ গুরুতর অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়লেন মো. সাহাবুদ্দিন। গতকাল শুক্রবার বিকেলে সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে তাঁর পক্ষে লিখিত পদত্যাগপত্র জমা দেওয়া হয়। সংবিধান অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। দায়িত্ব গ্রহণের পরে জাতীয় সংসদের শপথকক্ষে সংক্ষিপ্ত সংবাদ সম্মেলনে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ এবং নিজের দায়িত্ব গ্রহণ বিষয়ে কথা বলেন তিনি। দৃশ্যত এই প্রক্রিয়ার জন্যই থাইল্যান্ডে অবস্থান সংক্ষিপ্ত করে দুদিন আগে ফিরতে হয় স্পিকারকে।

গতকাল বিকেল ৫টা ১ মিনিটে সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে মো. সাহাবুদ্দিনের পক্ষে লিখিত পদত্যাগপত্র জমা দেন রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এ এস এম বাহাউদ্দিন ও প্রেস সচিব মো. সরওয়ার আলম। স্পিকার তা গ্রহণ করেন এবং এরপর সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির কার্যভার গ্রহণ করেন।

একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন আরও পড়ুন একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন

সংবাদ সম্মেলনের আগে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির ব্যবহারের জন্য একটি গাড়ি এবং বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী এসএসএফের একাধিক প্রটোকল গাড়ি সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে পৌঁছায়। এ ছাড়া সংসদ ভবন এলাকায় অবস্থিত স্পিকারের বাসভবনেও নেওয়া হয় বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা। ভবনের প্রধান ফটকে বসানো হয়েছে আর্চওয়ে গেট। বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ভবনের চারপাশে অবস্থান নেন।

সূত্রে জানা গেছে, বিকেল পৌনে পাঁচটার পরে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র নিয়ে সংসদ সচিবালয়ে প্রবেশ করেন রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব ও প্রেস সচিব। পরে তাঁরা স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র হস্তান্তর করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার (বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার) কায়সার কামাল, চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল ও সংসদ সচিবালয়ের সচিব মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া।

বিজ্ঞাপন

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির সংবাদ সম্মেলন উপলক্ষে জাতীয় সংসদের শপথকক্ষেও বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। সেখানে প্রবেশপথে আর্চওয়ে গেট এবং বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের অবস্থান দেখা যায়। সাড়ে পাঁচটার দিকে সংবাদ সম্মেলনস্থলে আসেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি সংবাদ সম্মেলনে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের বিষয় কথা বলেন। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের প্রক্রিয়া এবং বিদায়ী রাষ্ট্রপতি সম্পর্কে নিজে থেকে কিছু কথা বললেও সাংবাদিকদের তরফ থেকে আসা মাত্র দুটি প্রশ্নের উত্তর দেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি।

সংবাদ সম্মেলনে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, পদত্যাগপত্রে মো. সাহাবুদ্দিন হৃদ্‌রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভোগার কথা লিখেছেন। তাঁর হৃদ্‌যন্ত্রে বাইপাস সার্জারিও হয়েছে। সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তাঁর ‘অটোনমিক নিউরোপ্যাথি’ শনাক্ত হওয়ার কথাও পদত্যাগপত্রে জানানো হয়েছে। এই রোগের কারণে তিনি মাঝেমধ্যে অচেতন হয়ে পড়েন বলে উল্লেখ করেছেন। এসব রোগের প্রকোপ এবং শারীরিক ও মানসিক অসমর্থতার কারণে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করা তাঁর পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না বলে পদত্যাগপত্রে লিখেছেন সাহাবুদ্দিন।

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে নানা গুঞ্জনের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে স্পিকার বলেন, ‘আজ বাংলাদেশের নানা ধরনের কথাবার্তা আমি দুপুরে এসেই শুনছি। দেখা গেল যে, ... তিনি শারীরিক অসমর্থের কারণে পদত্যাগ করেছেন। আমি তাঁর মঙ্গল এবং সুস্বাস্থ্য কামনা করি।’

স্পিকার এরপর আরও বলেন, তাঁর মনে হয়, মো. সাহাবুদ্দিন ‘মাফিয়া সরকারের আমলে’ নির্বাচিত হলেও জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান সরকারের প্রতি সব সময় সমর্থন ও শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন।

পদত্যাগপত্রের সঙ্গে চিকিৎসকের সনদ বা কোনো চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজ দেওয়া হয়েছে কি না, একজন সাংবাদিকের এই প্রশ্নে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, রাষ্ট্রপতি নিজেই তাঁর রোগগুলোর নাম লিখিতভাবে জানিয়েছেন। এর জন্য ডাক্তারের সার্টিফিকেটের কোনো প্রয়োজন নেই।

স্পিকার বলেন, একজন মানুষ হিসেবে রাষ্ট্রপতি অসুস্থ হতেই পারেন। এর আগেও বিভিন্ন কারণে রাষ্ট্রপতিরা পদত্যাগ করেছেন। এই পদত্যাগের পর বিষয়টি নিয়ে সব বিভ্রান্তি দূর হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। এ নিয়ে কোনো বিশৃঙ্খলা বা বিরূপ প্রতিক্রিয়া যেন তৈরি না হয়, সেই আহ্বানও জানান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি।

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামের করা বিদায়ী রাষ্ট্রপতিকে গ্রেপ্তারের দাবি নিয়ে মতামত জানতে চাইলে স্পিকার বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমার কোনো মন্তব্য নাই।’ তিনি বলেন, সংবাদ সম্মেলনের বিষয় ছিল দেশের রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ। এরপর আর কোনো প্রশ্ন না নিয়ে সংবাদ সম্মেলন শেষ করেন তিনি।

সংবিধান অনুযায়ী দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন সংসদ সদস্যদের ভোটে। ১২৩(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, পদত্যাগের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির কার্যভার পালন করবেন (৫৪ অনুচ্ছেদ)। জাতীয় সংসদের স্পিকারের পদ শূন্য হলে স্পিকারের সকল দায়িত্ব পালন করবেন ডেপুটি স্পিকার।

রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর সংসদে স্পিকারের দায়িত্ব কীভাবে চলবে, তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘যেদিন আমি স্পিকার হিসেবে শপথ নিয়েছি, সেদিন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবেও শপথ নিয়েছি, যদি প্রয়োজন হয়। একইভাবে আমাদের ডেপুটি স্পিকার সাহেব, তিনিও যখন ডেপুটি স্পিকার হিসেবে শপথ নেন, শপথেরই অংশে বর্ণিত থাকে, যখন বলা হবে, কোনো কারণে যখন স্পিকারের চেয়ার শূন্য থাকবে, তখন ডেপুটি স্পিকার স্পিকারের পদের দায়িত্ব পালন করবেন।’

মো. সাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগের শাসনামলে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। রাষ্ট্রপতির পদের মেয়াদ পাঁচ বছর। তিনি ৩ বছর ৩ মাস দায়িত্বে থেকে পদত্যাগ করলেন। রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর মনোনয়ন নিয়েও সে সময় তৈরি হয়েছিল ধোঁয়াশা। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর বোন শেখ রেহানার যৌথ সিদ্ধান্তেই তাঁকে