বগুড়া শহরে রেলওয়ের একটি জলাশয়কে ভিটা দেখিয়ে ভরাটের চেষ্টা চলছে -সমকাল

প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪৭ | আপডেট: ২৬ জুলাই ২০২৬ | ১১:১৭

একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন আরও পড়ুন একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন

জালিয়াতির মাধ্যমে বগুড়া শহরে রেলওয়ের একটি জলাশয়কে ভিটা দেখিয়ে ভরাটের চেষ্টা চলছে। অভিযোগ উঠেছে, জামায়াতের দুই নেতাকর্মীর নেতৃত্বে ইজারা নিয়ে ওই জায়গায় বহুতল মার্কেটসহ নানা স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অভিযান চালিয়ে ভরাটের কাজ বন্ধ করে আগামীকাল সোমবার তাদের কাগজপত্র নিয়ে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।

ওই দুই নেতাকর্মী হলেন জামায়াত কর্মী ছাইফুল ইসলাম এবং জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দিনের ছেলে ও ২০ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হাকিম। তারা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

বিজ্ঞাপন

কাগজে-কলমে জলাশয়টির ইজারার লাইসেন্স ১৭ জনের নামে রয়েছে। তবে মুখ্য ভূমিকায় রয়েছেন ছাইফুল ইসলাম ও আব্দুল হাকিম।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বগুড়া সদরের চকবৃন্দাবন মৌজার ১ দশমিক ২৮ একর সরকারি জমি পুকুর শ্রেণিভুক্ত। শহরের গুরুত্বপূর্ণ জলাশয়টি স্টেশন রোডের পাশে অবস্থিত। এর বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

জলাশয়টি ২০২৩ সালে প্রথমে কৃষি লাইসেন্সের আওতায় লিজ নেওয়া হয়। পরে বাণিজ্যিক লাইসেন্সের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বালু দিয়ে ভরাট শুরু করলে স্থানীয়রা বাধা দেন। পরিবেশ অধিদপ্তরও আপত্তি জানায়। তখন কৌশল পাল্টে ভূমির শ্রেণি পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত বছরের ৫ নভেম্বর রেলওয়ের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসনের কাছে জমিটির শ্রেণি পরিবর্তনের আবেদন করা হয়। এর পর জেলা প্রশাসনের রাজস্ব শাখার তদন্তে দেখা যায়, এটি এখনও প্রাকৃতিক জলাশয় হিসেবেই বিদ্যমান। জলাশয়টি ভরাট করা হলে বগুড়া শহরের জলাবদ্ধতা আরও বাড়বে। এসব কারণ বিবেচনায় নিয়ে আবেদনটি নামঞ্জুর করা হয়।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, জেলা প্রশাসনের ওই সিদ্ধান্তের পর সামনে আসে আরেকটি কাগজ। সেখানে একই ভূমিকে ‘ভিটা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আরএস খতিয়ানের মূল নথিতে যেখানে ‘পুকুর’, সেখানে পরবর্তী সময়ে মাঠ রেকর্ডের ব্যবহৃত কাগজে সেটির শ্রেণি ‘ভিটা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের লিখিত সিদ্ধান্তের সঙ্গে এই কাগজের কোনো মিল পাওয়া যায়নি। এ কারণে সরকারি নথি বিকৃতি বা জালিয়াতির অভিযোগ সামনে এসেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগের পর অভিযান চালান নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পপি খাতুন ও জাহাঙ্গীর আলম। অভিযানে জলাশয়ের ওপর নির্মিত অবৈধ টিনের বেড়া অপসারণ করা হয়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ২৭ জুলাই কাগজপত্র নিয়ে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

পপি খাতুন সমকালকে বলেন, ‘আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রাথমিক প্রমাণ ছিল। সেখানে জলাশয়ে বালু ফেলে ভরাট করা হচ্ছিল। একই সঙ্গে ড্রেনের সীমানা অমান্য করে স্থাপনা নির্মাণেরও চেষ্টা হয়েছে। অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ২৭ জুলাই সংশ্লিষ্টদের কাগজপত্র যাচাই করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

এদিকে অভিযানের পরদিন ২২ জুলাই বগুড়া প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন লাইসেন্সধারীদের অন্যতম দাবিদার ছাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসন জমিটির শ্রেণি পরিবর্তন করে ‘ভিটা’ করেছে এবং সেই ভিত্তিতেই রেলওয়ে প্রায় ৭০ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করেছে।

জমির শ্রেণি পরিবর্তনসংক্রান্ত নথি জালিয়াতির অভিযোগ সম্পর্কে গত শুক্রবার জানতে চাইলে ছাইফুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ‘আমরা কোনো অবৈধ কাজ করিনি। প্রয়োজন হলে সব কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হবে।’

লাইসেন্সধারীদের অন্যতম জামায়াত নেতা আব্দুল হাকিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি লিজগ্রহীতাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহের আশ্বাস দেন। কিন্তু পরে তাঁর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলে তিনি রিসিভ করেননি। মেসেজ পাঠিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি।

বগুড়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ইমরুল কায়েস সমকালকে বলেন, ‘আমরা সরেজমিন তদন্ত করেছি। জায়গাটি এখনও প্রাকৃতিক জলাশয়। তাই আইন অনুযায়ী আবেদন বাতিল করা হয়েছে। কোনো পুকুর বা জলাশয়ের শ্রেণি পরিবর্তন করে ভিটা করার সুযোগ নেই। কেউ যদি এমন কোনো কাগজের দাবি করেন, সেটি সঠিক নয়।’

রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগের বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা মনজুর আলম বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী রেলওয়ের জমিতে কোনো ধরনের অবৈধ দখল বা স্থাপনা করতে দেওয়া হবে না। কোথাও অনিয়ম হয়ে থাকলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।