রেমব্রান্ট। পুরো নাম রেমব্রান্ট হারমেনসজোন ফান রেইন। তাঁর বিখ্যাত ছবি ‘নাইট ওয়াচের’ গায়ে একটি শিল্ড আছে, সেখানে আঠারোটা নাম খোদাই করা। এই আঠারোজন আমস্টারডামের নাগরিক মিলিশিয়ার সদস্য ছিলেন। ব্যবসায়ী, দোকানদার, পেশাজীবী, যাঁরা শহরের নিরাপত্তায় স্বেচ্ছায় অংশ নিতেন। সপ্তদশ শতকের আমস্টারডামে এটা সামাজিক মর্যাদার বিষয় ছিল। মিলিশিয়ায় থাকা মানে শহরের দায়িত্বশীল নাগরিক। আর সেই মর্যাদা স্থায়ী করার একটা সহজ পথ ছিল, দলের একটা গ্রুপ পোর্ট্রেট আঁকানো, যেটা তাদের সদর দপ্তরে ঝুলবে।

এই আঠারোজনের প্রত্যেকে নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়েছিলেন ছবিতে জায়গা পাওয়ার জন্য। টাকার পরিমাণ এক শ গিল্ডারের কাছাকাছি, কেউ একটু বেশি, কেউ কম। কত দেবেন, সেটা নির্ভর করত ক্যানভাসে কোথায় দাঁড়াবেন তার ওপর। আলোর কাছে দাঁড়াতে চাইলে বেশি, ছায়ায় থাকতে রাজি হলে কম।

একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন আরও পড়ুন একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন

এক শ গিল্ডার কি অনেক টাকা? সেই সময়ে আমস্টারডামে একজন দক্ষ কারিগরের বার্ষিক আয় ছিল আনুমানিক আড়াই শ গিল্ডার। অর্থাৎ একটা ছবিতে জায়গা পেতে প্রায় পাঁচ মাসের আয় লাগত। এটা বিলাসিতা, এবং সেই বিলাসিতার বিনিময়ে যা কেনা হচ্ছিল, সেটা আসলে দৃশ্যমানতা।

কিন্তু ক্যানভাসে আঠারোর বেশি মানুষ আছে। ছবির ডান দিকে, প্রায় প্রান্তে, একজন ড্রামবাদক ড্রাম বাজাচ্ছে। শিল্ডে তার নাম নেই। সে টাকা দেয়নি। তাকে বিনা মূল্যে ছবিতে রাখা হয়েছে, সম্ভবত দৃশ্যটাকে জীবন্ত করার জন্য, রেমব্রান্টের নিজের সিদ্ধান্তে। ফলে ইতিহাসের নথিতেও তার নাম পাওয়া যায় না। চার শ বছর ধরে এই মানুষটা ক্যানভাসে আছে, কিন্তু ইতিহাসে নেই।

বিজ্ঞাপন

সে দৃশ্যমান, কিন্তু স্বীকৃত নয়।

শত শত বছর ধরে ইউরোপে শিল্পীর পৃষ্ঠপোষক ছিল দুজন, চার্চ আর রাজা। ইতালিতে পোপ মাইকেলেঞ্জেলোকে সিস্টিন চ্যাপেলের ছাদ আঁকতে বলেছিলেন। স্পেনে রাজা ফিলিপ ভেলাস্কেজকে দরবারি চিত্রকর নিয়োগ করেছিলেন। শিল্পী জানতেন তাঁর ছবি কোথায় যাবে, গির্জায় নাকি প্রাসাদে। এবং কাকে তাঁর সন্তুষ্ট করতে হবে। স্বাধীনতা কম, কিন্তু জীবিকার নিশ্চয়তা ছিল।

ইউরোপের মধ্যে নেদারল্যান্ডসে পুরো ছবিটা এর চেয়ে আলাদা দাঁড়াল। ষোড়শ শতকে ক্যালভিনিস্ট ধর্মসংস্কার এই অঞ্চলের শিল্পকাঠামো ভেঙে দিল। ক্যালভিনিজম ধর্মীয় চিত্রকলাকে সন্দেহের চোখে দেখত। তাদের মতে, ঈশ্বরের ছবি আঁকা মূর্তিপূজার কাছাকাছি। ফলে গির্জায় ছবি রাখার রীতি প্রায় বন্ধ হলো। একই সঙ্গে নেদারল্যান্ডস স্পেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে একটা প্রজাতন্ত্র হলো, যেখানে রাজার বদলে বণিক পরিষদ শাসন চালাত। দরবারি পৃষ্ঠপোষকতাও তাই নেই। শিল্পীর দুটি চিরকালীন আশ্রয়, ঈশ্বর ও রাজা, দুটোই সরে গেল।

সপ্তদশ শতকে ডাচ প্রজাতন্ত্র ইউরোপের সবচেয়ে ধনী বাণিজ্যিক শক্তি। ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। ইন্দোনেশিয়া থেকে মসলা, ভারত থেকে কাপড়, জাপান থেকে রুপা আনছে। আমস্টারডাম ইউরোপের আর্থিক রাজধানী। এই সম্পদের ভেতর থেকে একটি নতুন শ্রেণি উঠে এসেছে। জাহাজমালিক, কাপড় ব্যবসায়ী, যাদের হাতে টাকা আছে কিন্তু রক্তে অভিজাত বংশের সিল নেই।

তাদের সামাজিক মর্যাদা প্রমাণের হাতিয়ার হয়ে উঠল প্রতিকৃতি। আমার ঘরের দেয়ালে আমার ছবি ঝুলছে, এটা একটা সামাজিক ঘোষণার মতো হয়ে দাঁড়াল।

সপ্তদশ শতকে শুধু ডাচ প্রজাতন্ত্রেই আনুমানিক দশ লাখ ছবি আঁকা হয়েছিল, যার বড় অংশ প্রতিকৃতি। তখনকার জনসংখ্যা বিশ লাখের কাছাকাছি। প্রতি দুজনে একটি ছবি। ছবি প্রায় নিত্যপণ্যে পরিণত হয়ে গেল।

এই বাজারে শিল্পীরা ‘গিল্ড অব সেন্ট লুক’-এর অধীনে সংগঠিত ছিলেন। ঠিক যেমন রুটির দোকানদার বা ছুতোর মিস্ত্রিদের গিল্ড ছিল, শিল্পীদেরও। গিল্ড প্রশিক্ষণ দিত, মান নিয়ন্ত্রণ করত, বাজারে প্রবেশের অনুমতি দিত। শিল্পী হওয়া মানে একটা স্বীকৃত পেশায় ঢোকা, যার নিয়মকানুন আছে, প্রতিযোগিতা আছে, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, ক্রেতা সন্তুষ্ট করার চাপ আছে।

রেমব্রান্ট এই বাজারের ভেতর থেকেই উঠে এসেছিলেন। তিনি লেইডেনের একজন মিলারের ছেলে। পরিবার শ্রমজীবী, অভিজাত না। লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্তু ছেড়ে দিয়ে ছবি আঁকা শুরু করেন। মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে আমস্টারডামের সার্জনদের সংগঠন তাকে বেছে নিল তাদের গ্রুপ পোর্ট্রেটের জন্য, ‘দ্য অ্যানাটমি লেসন অব ড. নিকোলেস টুল্প, ১৬৩২’।

একজন তরুণ, প্রায় অপরিচিত শিল্পী, আর শহরের সবচেয়ে ক্ষমতাবান পেশাদার গোষ্ঠী তাকে বেছে নিয়েছে। এটাই বলে দেয় এই বাজার কতটা প্রতিযোগিতামূলক আর কতটা সুযোগসন্ধানী। কিন্তু বাজারের যেকোনো ব্যবস্থার মতো এরও অন্ধকার দিক আছে। যেখানে ছবি আঁকা হয় টাকার বিনিময়ে, সেখানে ক্যানভাসে কে থাকবে আর কে থাকবে না, সেটা নিছক শৈল্পিক সিদ্ধান্ত ছাড়াও একধরনের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত।

এই অর্থনীতি ক্যানভাসের ভেতরে কীভাবে কাজ করে, সেটা দেখা যায় রেমব্রান্টের তিনটি গ্রুপ পোর্ট্রেটে। তিনটি ভিন্ন দশকে আঁকা, তিনটি ভিন্ন পৃষ্ঠপোষক গোষ্ঠীর জন্য। কিন্তু তিনটিতেই একটা প্রশ্ন করা যায়, আলো কাদের ওপর পড়ছে, আর কারা অন্ধকারে?

প্রথম ছবি, ‘দ্য অ্যানাটমি লেসন অব ড. নিকোলেস টুল্প’। সপ্তদশ শতকের আমস্টারডামে বিভিন্ন পেশাদার সংগঠন, সার্জন, মিলিশিয়া, বণিক সমিতি, তাদের সদর দপ্তরে একটা দলীয় ছবি ঝোলাতেন। এটা ছিল সাংগঠনিক গর্বের প্রতীক এবং ছবিতে থাকা প্রত্যেক মানুষ নিজের অংশের টাকা দিতেন।

ডক্টর টুল্পের এই ছবিতে তিনি একটি মৃতদেহের বাঁ বাহুর পেশি ব্যবচ্ছেদ করছেন, এটা তখনকার আমস্টারডামে একটা বার্ষিক আনুষ্ঠানিক ঘটনা ছিল, যেখানে গিল্ডের অনুমতিতে মৃতদেহ কেটে দেখানো হতো এবং শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা দর্শক হিসেবে উপস্থিত থাকতেন।

ছবিতে ডক্টর টুল্পের হাতে ফরসেপস, আলো পড়ছে সেই হাতে আর মৃতদেহের খোলা বাহুতে। চারপাশে সাতজন সার্জন, প্রত্যেকের মুখ স্পষ্ট, তারা ব্যক্তি হিসেবে চেনা যায়।

কিন্তু মৃতদেহটি? ক্যানভাসের সবচেয়ে বেশি জায়গা দখল করে শুয়ে আছে, অথচ সে এই ছবির সবচেয়ে অদৃশ্য মানুষ। অনেক পরে জানা গেছে তার নাম অ্যারিস কিন্ট। একজন দণ্ডিত চোর, সেদিন সকালেই যার ফাঁসি হয়েছিল। ডাচ