প্রশ্নপত্র একটু কঠিন হলেই আপত্তি, পরীক্ষার হলে কড়াকড়ি হলেই অসন্তোষ, নকল ঠেকাতে ব্যবস্থা নিলেই আন্দোলনের ডাক—এগুলোকে শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এগুলো আমাদের সমাজে তৈরি হওয়া একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। লিখেছেন মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার

২০০৪ সালে প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডে পড়তে গিয়েছিলাম। একদিন ট্রেনে বসে একটি স্থানীয় পত্রিকায় পড়লাম, কয়েকটি স্কুলে শিক্ষার্থীদের পোশাক ও মুঠোফোন ব্যবহার নিয়ে নতুন নিয়ম চালু হচ্ছে। অবাক হয়ে ভাবলাম, যে সমাজ ব্যক্তিস্বাধীনতার কথা এত জোর দিয়ে বলে, তারা আবার শিশুদের জন্য এত কড়াকড়ি করছে কেন?

নিপীড়নের বিরুদ্ধে মশাল জ্বেলে গানে গানে প্রতিবাদ শিক্ষার্থীদের আরও পড়ুন নিপীড়নের বিরুদ্ধে মশাল জ্বেলে গানে গানে প্রতিবাদ শিক্ষার্থীদের

কয়েক বছর পর অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে গেলাম। পড়াশোনার পাশাপাশি একটি দোকানে কাজ করতাম। প্রতিদিন সিগারেটের প্যাকেট বিক্রি করতে হতো। প্যাকেটজুড়ে থাকত ক্যানসারে আক্রান্ত মানুষের ছবি, নষ্ট হয়ে যাওয়া ফুসফুস কিংবা ক্ষতবিক্ষত গলার দৃশ্য। প্রথমে বিষয়টি অদ্ভুত লাগত। পরে বুঝলাম, এটি সিগারেটের বিরুদ্ধে নয়; আসক্তির বিরুদ্ধে লড়াই। নতুন প্রজন্মকে শুরুতেই সতর্ক করা গেলে ভবিষ্যতের ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

সময় এগিয়ে গেছে। আমার দুই সন্তান এখন স্কুলে পড়ে। স্কুল তাদের জন্য আলাদা ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট দিয়েছে। কিন্তু সেটি পুরোপুরি তাদের নিয়ন্ত্রণে নয়। অভিভাবক হিসেবে আমরাও দেখতে পারি তারা কী ব্যবহার করছে, কী ধরনের ভিডিও দেখছে। ইউটিউবেও বয়সভিত্তিক নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে। পরে বুঝেছি, এটি অবিশ্বাস নয়; দায়িত্ব। যেমন ১০ বছরের একটি শিশুর হাতে গাড়ির চাবি তুলে দেওয়া যায় না, তেমনি সীমাহীন ডিজিটাল স্বাধীনতাও তার জন্য নিরাপদ নয়।

বিজ্ঞাপন

ঠিক তখনই আগের সেই ছোট্ট সংবাদটির কথা আবার মনে পড়ল। ইংল্যান্ডের স্কুল, অস্ট্রেলিয়ার সিগারেটের প্যাকেট আর আজকের ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ—সব যেন একসুতায় গাঁথা। তখন নিজের কাছেই একটি প্রশ্ন করলাম, যারা এই ডিজিটাল পৃথিবী তৈরি করেছে, তারাই কেন নিজেদের সন্তানদের জন্য একের পর এক সীমারেখা টেনে দিচ্ছে?

উন্নত দেশগুলো হঠাৎ এত চিন্তিত কেন?

শিশু-কিশোরদের ডিজিটাল জীবন নিয়ে গত এক দশকে অনেক গবেষণা হয়েছে। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক মনোবিজ্ঞানী জোনাথন হাইট তাঁর আলোচিত বই দ্য অ্যাঙ্কশাস জেনারেশন-এ দেখিয়েছেন, গত দুই দশকে শিশুদের শৈশব ধীরে ধীরে খেলার মাঠ থেকে মুঠোফোনের পর্দায় চলে গেছে। এর ফলে তাদের মনোযোগ, মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মার্কিন মনোবিজ্ঞানী জিন টুয়েঞ্জ। তিনি তাঁর বই আইজেন ও পরবর্তী গবেষণায় দেখিয়েছেন, স্মার্টফোননির্ভর জীবন শিশু-কিশোরদের আচরণ ও মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সতর্কবার্তা দিয়েছে ইউনিসেফের ‘চাইল্ডহুড ইন আ ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড’ প্রতিবেদনও। সেখানে বলা হয়েছে, অনিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল ব্যবহার শিশুদের ঘুম, শেখার ক্ষমতা, মানসিক সুস্থতা ও সামাজিক বিকাশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

এই উদ্বেগ থেকেই বিশ্বের অনেক দেশ নীতিগত পদক্ষেপ নিচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া ২০২৪ সালে আইন পাস করে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বয়সসীমা নির্ধারণ করেছে (শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করে অস্ট্রেলিয়ায় প্রস্তাব পাস, ২৯ নভেম্বর ২০২৪)। যুক্তরাজ্যও স্কুলে স্মার্টফোন ব্যবহার নিয়ে নতুন নির্দেশনা দিয়েছে (মোবাইল ফোনস ইন স্কুলস: গাইডেন্স ফর স্কুলস, যুক্তরাজ্যের শিক্ষা বিভাগ, ২০২৪)।

ফ্রান্স ২০১৮ সালেই স্কুলে মুঠোফোন নিষিদ্ধ করেছিল। এর ধারাবাহিকতায় প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। নেদারল্যান্ডস, ইতালিসহ আরও কয়েকটি ইউরোপীয় দেশও শ্রেণিকক্ষে স্মার্টফোন ব্যবহারে কড়াকড়ি করেছে।

ওপরের উদাহরণ থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট; দেশভেদে নিয়ম হয়তো কিছুটা আলাদা, কিন্তু লক্ষ্য একটাই—শিশুদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করা। তাই প্রশ্নটি শুধু অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড বা ফ্রান্সের নয়; প্রশ্নটি আমাদেরও। তাদের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা কী শিখব?

ফেসবুক, ইউটিউব বা টিকটক কি শুধুই বিনোদন?

আমরা অনেকেই মনে করি টিকটক, ফেসবুক রিলস বা ইউটিউব শর্টস তো শুধু বিনোদনের মাধ্যম। কয়েক মিনিট দেখলাম, তারপর রেখে দিলাম। কিন্তু বাস্তবতা কি এত সহজ?

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো শুধু ভিডিও দেখানোর জন্য তৈরি হয়নি; এগুলো তৈরি হয়েছে আমাদের যত বেশি সময় সম্ভব পর্দার সামনে ধরে রাখার জন্য। প্রযুক্তিবিশ্বের ভাষায় একে বলা হয় ‘অ্যাটেনশন ইকোনমি’ অর্থাৎ আপনি যত বেশি সময় একটি প্ল্যাটফর্মে থাকবেন, তত বেশি বিজ্ঞাপন দেখবেন, আর সেই প্রতিষ্ঠানের আয়ও তত বাড়বে।

এ কারণেই এসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এমনভাবে কাজ করে, যাতে একটি ভিডিও শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি ভিডিও সামনে চলে আসে। আপনি থামতে চাইলে প্ল্যাটফর্মটি চায় আপনি আরও কিছুক্ষণ থাকুন। কয়েক মিনিটের জন্য ফোন হাতে নিলেও কখন যে এক ঘণ্টা কেটে যায়। প্রাপ্তবয়স্ক একজন মানুষই যদি এই অ্যালগরিদমের প্রভাব পুরোপুরি এড়াতে না পারেন, তাহলে ১২, ১৪ বা ১৬ বছরের একটি শিশুর পক্ষে তা কতটা কঠিন, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

তাই প্রশ্নটি টিকটক, ফেসবুক বা ইউটিউব থেকে দূরে থাকা নয়; প্রশ্ন হলো একটি শিশু কখন, কতক্ষণ এবং কী উদ্দেশ্যে এসব মাধ্যম ব্যবহার করবে? সেই সিদ্ধান্ত কে নেবে, অ্যালগরিদম, নাকি পরিবার, স্কুল ও রাষ্ট্র?

আমরা কি পরিশ্রমের সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলছি?

এতক্ষণ প্রযুক্তি নিয়ে যে আলোচনা করলাম, সেটি শুধু মুঠোফোন বা টিকটকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব ধীরে ধীরে আমাদের শিক্ষা, চিন্তাভাবনা ও সামাজিক আচরণেও পড়ছে। সাম্প্রতিক এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষা ঘিরে যে আলোচনা হয়েছে, সেটিও সেই পরিবর্তনের একটি উদাহরণ। প্রশ্নপত্র একটু কঠিন হলেই আপত্তি, পরীক্ষার হলে কড়াকড়ি হলেই অসন্তোষ, নকল ঠেকাতে ব্যবস্থা নিলেই আন্দোলনের ডাক—এগুলোকে শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এগুলো আমাদের সমাজে