ছবির উৎস, Pictures From History/Universal Images Group via Getty Images
প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী ভারতে ইসলামের আগমন ঘটেছিল ৭১২ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া শাসনামলে যখন মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধ আক্রমণ করেছিলেন, অর্থাৎ তরবারির শক্তির ওপর ভর করেই ভারতে ইসলামের আগমন হয়েছিল। তবে অনেক পণ্ডিত এই ধারণার সঙ্গে সহমত নন।
আরও পড়ুন
শিল্প, জলবায়ু ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তিকে একসূত্রে আনল ‘দ্য তত্ত্বমসি সার্কেল’
ইতিহাসবিদদের অনেকেই মনে করেন ইসলামের আগমন কোনো একক ঘটনার ফল নয়; বরং এটা কয়েক শতাব্দী ধরে চলে আসা ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রক্রিয়ার পরিণাম।
ইতিহাসবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন এবং তার সমর্থনে বিভিন্ন তত্ত্বও পেশ করেন।
এরই মধ্যে অন্যতম মতবাদ হলো, ভারতে ইসলামের প্রচারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল বাণিজ্য।
প্রাচীনকাল থেকেই ভারত মশলার জন্য সারা বিশ্বে পরিচিত। মশলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ছিল গোল মরিচ বা কালো মরিচের। আরব দেশ থেকে শুরু করে গ্রীক ও রোমান সাম্রাজ্য পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল ভারতীয় গোল মরিচের সুনাম।
গোল মরিচের ব্যবসা সম্পর্কে বিশদে বোঝার জন্য আমরা কেরালার কোচি শহর হয়ে কোদুঙ্গাল্লুরে পৌঁছেছিলাম।
স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, এক সময় এখানেই ছিল প্রাচীন মুজিরিস বন্দর। পনেরশো শতাব্দীর বিধ্বংসী বন্যায় সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায় এই বন্দর।
ইনস্টাগ্রামে বিবিসি বাংলা ফলো করতে ক্লিক/ট্যাপ করুন এখানে
ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
কেরালা যাওয়ার আগে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক এবং মধ্যযুগীয় ইতিহাসের শীর্ষস্থানীয় ইতিহাসবিদ সৈয়দ জাহির হুসেইন জাফরির সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলেছিলাম।
তার মতে, আরব সাগর ছিল বঙ্গোপসাগরের তুলনায় শান্ত। ইতিহাসবিদ জাফরির মতে, এই সাগরে যদি একটা খড় বা কাঠের টুকরোও ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলেও সেটা আরব ও ওমান উপকূলে পৌঁছাতে পারত।
দীর্ঘদিন ধরে এই সমুদ্রপথে আরবদের প্রভাব ছিল। তারা ভারতে আসতেন বর্ষার সময়ে। এখানে কিছুদিন কাটিয়ে বর্ষা শেষে আরবে ফিরে যেতেন।
অধ্যাপক জাফরির মতে, এই সমুদ্রপথ দিয়েই শ্রীলঙ্কা, জাভা, সুমাত্রা, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছেছিল আরবরা।
বিখ্যাত ইতিহাসবিদ সৈয়দ সুলেমান নদভী তার বই 'আরব ওয়াহ হিন্দ কে তাল্লুকাৎ', বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় আরব ও ভারতের সম্পর্ক, সেখানে লিখেছিলেন, "ইউরোপ ও ভারতের মধ্যে সমুদ্রপথ ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একসময়ে এটা সম্পূর্ণভাবে আরবদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু যিশু খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৩০০ বছর আগে যখন গ্রীকরা মিশর জয় করে, সেই সময়ে তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে এই সমুদ্রপথ।"
তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, "যিশু খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৬০০ বছর পর, যখন ইসলামের আবির্ভাব ঘটে এবং আরবদের প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে, সেই সময়ে, ষষ্ঠ শতাব্দীতে, মিশর থেকে স্পেন পর্যন্ত তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। একইসঙ্গে তারা ভূমধ্যসাগরের নিয়ন্ত্রণও নেয়। ফলে, বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ আরবদের হাতে চলে যায়, আর পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে তাদের নিয়ন্ত্রণেই থাকে এই বাণিজ্য পথটি।"
অধ্যাপক জাফরির মতে, ভারতে থাকাকালীন অনেক আরব ব্যবসায়ী স্থানীয় নারীদের বিয়েও করেছিলেন। আরব ও ভারতের মধ্যে এই দীর্ঘ যোগাযোগের ফলে দক্ষিণ ভারতে 'মাপ্পিলা মুসলিম' নামে এক মুসলিম সম্প্রদায়ের বিকাশ ঘটে।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন
দক্ষিণ ভারতে মুসলমানরা ঠিক কোন সময়ে এসেছিলেন, তা সঠিকভাবে অনুমান করা কঠিন, কারণ এর সমর্থনে খুব কমই ঐতিহাসিক প্রমাণ রয়েছে।
আরবের নাবিকরা তাদের সফরের বিষয়ে কোনো লিখিত নথি রেখে যাননি। তারা যে সমস্ত ভবন তৈরি করেছিলেন সেখানে খোদাই করা কোনো শিলালিপি নেই। তবে যদি কোনো শিলালিপি থেকেও থাকে, ষোড়শ শতাব্দীতে পর্তুগিজদের আগমন এবং মুসলমানদের সঙ্গে তাদের সংঘাতের সময়ে সেসবের বড় অংশই সম্ভবত ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিলো।
রাজনীতিবিদ ও লেখক শশী থারুর প্রায়শই উল্লেখ করে থাকেন যে, ইসলামের আগমনের কয়েক শতাব্দী আগে থেকেই আরবের বণিক এবং নাবিকরা মালাবার উপকূলে যাতায়াত করতেন।
তার মতে, ভারতে যে সময় ইসলামের আবির্ভাব হয়েছিল, তখন তা তলোয়ারের জোরে কেরালায় পৌঁছায়নি, বরং পরিচিত ও বিশ্বস্ত আরব বণিকদের হাত ধরে ওই অঞ্চলে ইসলাম এসেছিলো, যারা ইতোমধ্যে স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ছিলেন।
পাশাপাশি কেরালার হিন্দু রাজা চেরামন পেরুমলের ইসলামে ধর্মান্তরিত হওয়ার গল্পও এই বিষয়ে প্রচলিত ধারণার অংশ।
আমরা খুব ভোরে কেরালার ফোর্ট কোচি থেকে কোচি হেরিটেজ প্রজেক্টের প্রতিষ্ঠাতা ইয়োহান বেন্নি কুরুভিলা এবং আমাদের চিত্রগ্রাহক বিমল থাঙ্কাচানের সঙ্গে কোদুঙ্গাল্লুরের পেরিয়ার নদীর তীরে পৌঁছাই।
সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন কোট্টায়ামের মহাত্মা গান্ধী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্ডিয়া-আরব কালচার সেন্টারের সাবেক পরিচালক এমএইচ ইলিয়াস।
ছবির উৎস, keralatourism.org
প্রফেসর ইলিয়াসের মতে, দক্ষিণ ভারতে ইসলামের আগমন সম্পর্কে চারটি প্রধান তত্ত্ব রয়েছে।
প্রথম তত্ত্ব অনুযায়ী, ইসলামের নবীর জীবদ্দশাতেই ইসলাম প্রাচীন মুজিরিস বন্দর দিয়ে ভারতে পৌঁছেছিল।
এই দাবির সমর্থনে চেরামন জামা মসজিদের কথা উল্লেখ করা হয়। এটা ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে মালিক বিন দিনারের উদ্যোগে নির্মিত হয়েছিল বলে জানা যায়। মসজিদের শিলালিপিতেও এর উল্লেখ রয়েছে।
তবে ইতিহাসবিদদের অনেকেই নির্দিষ্টভাবে তারিখ সম্পর্কে মতামত দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। এর কারণ কোথাও মালিক ইবনে দিনারকে 'সাহাবী' হিসেবে গণ্য করা হয়, কোথাও আবার তাকে 'তাবাঈনে'র অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সাহাবী বলতে তাদেরই বোঝায় যারা ইসলাম গ্রহণের পর ইসলামের নবীর সাক্ষাৎ পেয়েছেন, আর তাবাঈন হলেন তারা, যারা ইসলাম গ্রহণের পর সাহাবীদের সান্নিধ্য পেয়েছেন।
এই মসজিদ প্রতিষ্ঠা নিয়ে অনেক গল্প প্রচলিত রয়েছে। কোদুঙ্গাল্লুরের হিন্দু রাজা চেরামন পেরুমলকে আ