২৩ বছর ধরে আদালতের বারান্দায় ঘুরেছে একটি পরিবার। অপহরণের পর মুক্তিপণের টাকা দেওয়া হয়েছে, দুই বছর পর উদ্ধার হয়েছে একটি কঙ্কাল, সিঙ্গাপুরে ডিএনএ পরীক্ষায় মিলেছে পরিচয়, সাড়ে তিন বছর ধরে তদন্ত করেছেন পুলিশের ৯ কর্মকর্তা, হয়েছে নারাজি আবেদন, উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ আর বিচারিক জটিলতা। কিন্তু এত কিছুর পরও শেষ হয়নি চট্টগ্রামের আলোচিত ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতা জামাল উদ্দিন চৌধুরী হত্যা মামলার বিচার।
শুধু তা–ই নয়, এখন আর জামাল উদ্দিনের পরিবারের সদস্যরা এ মামলার বিচারও চান না। তাঁদের দাবি, যাঁদের বিরুদ্ধে জামাল উদ্দিনকে অপহরণ ও হত্যার অভিযোগ রয়েছে, তদন্তে তাঁদের নামই আসেনি। প্রকৃত আসামিদের বাদ দিয়ে যে বিচার চলছে, সেটিকে তাঁরা অর্থবহ মনে করেন না।
আরও পড়ুন
একাধিক রাজ্যে ধরপাকড়, ককরোচেরা উদ্বিগ্ন
আজ থেকে ২৩ বছর আগে চট্টগ্রাম নগরের ব্যস্ততম এলাকা চকবাজার থেকে অপহরণ করা হয়েছিল জামাল উদ্দিনকে। তিনি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। সে সময় আনোয়ারা থেকে সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবেও তাঁর নাম আলোচনায় ছিল। তাঁর অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি, কঙ্কাল উদ্ধার ও দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া দেশব্যাপী আলোচিত হয়েছিল।
সে ঘটনায় ফিরে তাকালে প্রশ্ন ওঠে—একটি বহুল আলোচিত হত্যা মামলার বিচার কেন এখনো শেষ হলো না? আর কেনই–বা নিহত ব্যক্তির পরিবার আজ আর এই বিচার চায় না?
২০০৩ সালের ২৪ জুলাই রাতে নগরের চকবাজারে নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে চান্দগাঁওয়ের বাসায় ফিরছিলেন জামাল উদ্দিন। পথেই তাঁকে অপহরণ করা হয়। ঘটনার পর তাঁর পরিবারের কাছে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। প্রশাসনের পরামর্শে অপহরণকারীদের ২৫ লাখ টাকা দিয়েছিল পরিবার। কিন্তু জীবিত ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি তাঁকে।
পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর প্রথম দিকে পুলিশ এটিকে সাজানো নাটক বলে মন্তব্য করে। মামলা নিতেও গড়িমসি করা হয়। পরে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা নেওয়া হয়।
অপহরণের প্রায় দুই বছর পর অর্থাৎ ২০০৫ সালে আনোয়ারা সদরের সাবেক ইউপি সদস্য মো. শহীদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই বছরের ২৪ আগস্ট চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির কাঞ্চননগরের পাহাড়ি এলাকা থেকে জামাল উদ্দিনের একটি কঙ্কাল উদ্ধার করে র্যাব। পরে সিঙ্গাপুরে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায়, সেটি জামাল উদ্দিনেরই।
জবানবন্দিতে উঠে আসে অপহরণের বর্ণনা
মামলার দুই আসামি শহীদুল ইসলাম ও মাহবুবের আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জামাল উদ্দিনকে অপহরণ ও হত্যার ঘটনার বিস্তারিত উঠে আসে। এতে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে ২৫ লাখ টাকা গ্রহণ ও অপহরণের সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, তাঁদের নামও উল্লেখ করা হয়।
২০০৫ সালের ৩১ আগস্ট আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘জামাল উদ্দিনের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ চাই। পরে নাজিম, হেলাল ও অমর মোবাইল ফোনে বলে ২৫ লাখ টাকা দেওয়ার কথাবার্তা হয়েছে।’
পরিবারের দাবি, ওই জবানবন্দি ও ঘটনাপ্রবাহে যাঁদের নাম উঠে এসেছে, তাঁদের অনেককেই তদন্তে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এ কারণেই মামলার বর্তমান বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর তাদের আস্থা নেই।
তদন্ত থেকে বিচারের দীর্ঘ পথ
জামাল উদ্দিন হত্যা মামলার তদন্ত করেছেন পুলিশের ৯ কর্মকর্তা। প্রায় সাড়ে তিন বছর তদন্ত শেষে ২০০৬ সালে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ২৪ জনকে অব্যাহতি দিয়ে ও ১৬ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র জমা দেয়। অব্যাহতি পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন আনোয়ারার বর্তমান সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম ও তাঁর ছোট ভাই মারুফ নিজাম।
এই অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করেন মামলার বাদী ও নিহত জামাল উদ্দিনের বড় ছেলে চৌধুরী ফরমান রেজা লিটন। এরপর মামলাটি জড়িয়ে পড়ে দীর্ঘ আইনি জটিলতায়। রাজসাক্ষী করার বিষয়ে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ, লিভ টু আপিল ও বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০১৬ সালে মামলাটি আবার বিচারিক ধারায় ফিরে আসে।
২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত সিআইডির দেওয়া অভিযোগপত্র গ্রহণ করে বাদীর নারাজি আবেদন খারিজ করে দেন। এর এক বছর পর ১৪ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়।
কিন্তু বিচার শুরুর আট বছর পরও মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ই পেরোতে পারেনি।
৯ বছর ধরে সাক্ষ্য দিতে যাচ্ছেন না বাদী
আদালত সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে মামলাটিতে ৮৪ সাক্ষীর মধ্যে মাত্র তিনজন সাক্ষ্য দিয়েছেন। গত ২০ মে সাক্ষী উপস্থিত না হওয়ায় ২৭ জুলাই পরবর্তী তারিখ ধার্য করেছেন আদালত।
মামলার ১৪ আসামির মধ্যে ১০ জন জামিনে রয়েছেন। একজন কারাগারে আছেন এবং চারজন পলাতক।
আর ৯ বছর ধরে আদালতে গিয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছেন না মামলার বাদী চৌধুরী ফরমান রেজা লিটন। দীর্ঘ ১৪ বছর তিনি থানা–পুলিশ, আদালত ও প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। এখন আর আদালতে যান না।
গত মঙ্গলবার রাতে প্রথম আলোকে চৌধুরী ফরমান রেজা লিটন বলেন, ‘মূল আসামিরা কেউ নেই। তাঁদের বাদ দেওয়া হয়েছে। বারবার নারাজি দিয়েছি, শেষ পর্যন্ত পারিনি। তাই আদালতে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছি।’
চৌধুরী ফরমান রেজা লিটন বলেন, ‘আসামির জবানবন্দি ছাড়াও সবাই জানে কারা, কেন আমার বাবাকে মেরেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমাকে তিনটি মামলার আসামি করা হয়েছিল। ভয়ে তখন কিছু করতে পারিনি। এখন বিএনপি সরকার গঠন করেছে। প্রকৃত আসামিদের আইনের আওতায় আনা হোক।’
চৌধুরী ফরমান রেজা আরও বলেন, ‘আমার বাবার খুনিরা শক্তিশালী। তাদের টাকা ও ক্ষমতার কাছে আমরা অসহায়। এখন আমাদের ভরসা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। তিনি বিভিন্ন সময়ে আমাদের খোঁজ নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চাইলে এই হত্যার প্রকৃত আসামিদের বিচার হবে। নইলে এই মামলার কিছু হবে না।’
কী বলছেন অভিযুক্ত ব্যক্তিরা
জামাল উদ্দিন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও চট্টগ্রাম–১৩ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তবে গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তিনি প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘তদন্তে আমার নাম উঠে আসেনি। এগুলো আওয়ামী দোসরদের ষড়যন্ত্র।’
অন্যদিকে এক আ