ইরানের কেশম, কিশ ও আবু মুসা দ্বীপে সম্প্রতি হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। তাদের চলমান ব্যাপক সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে এ হামলা চালানো হয়। অভিযানের আওতায় বন্দর আব্বাসসহ ইরানের দক্ষিণ উপকূলের বিভিন্ন বন্দরনগরীতেও ব্যাপক বোমাবর্ষণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
এ হামলার পর পুরোনো একটি প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধের প্রথম দিক থেকেই প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছিল। আর তা হলো, ওয়াশিংটন কি ইরানের ভূখণ্ড দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছে?
আরও পড়ুন
বিশ্বকাপ দেখতে আসা বাংলাদেশিদের ২২% কানাডায় অ্যাসাইলাম চেয়েছেন এখন পর্যন্ত
যুদ্ধের এক মাস পর গত মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের দুজন কর্মকর্তা দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে একটি তথ্য দেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা জানান, ইরানের খারগ দ্বীপে অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। ইরানের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই দ্বীপ দিয়ে হয়ে থাকে। মার্কিন কর্মকর্তাদের এমন মন্তব্যের পর সেখানে স্থল অভিযানের গুঞ্জন আরও জোরালো হয়েছিল।
গত ১৭ জুন দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। এরপর দ্বীপ দখলের আলোচনা কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। তবে গত সোমবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন সম্ভাবনার কথা উড়িয়ে দেননি। এরপর বিষয়টি আবার নতুন করে সামনে এসেছে।
এ ধরনের কোনো অভিযানের পরিকল্পনা আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আপনাকে এটি বলতে পারব না। কারণ, আমি যদি বলি, তবে তা বোকামি হবে।’
তাহলে প্রশ্ন জাগে, এটি কি কেবলই যুদ্ধংদেহী কথাবার্তা, নাকি সত্যিই এমন কিছু ঘটার আশঙ্কা রয়েছে?
ইরানের দ্বীপ দখলে মার্কিন সক্ষমতা
লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক অ্যান্ড্রিয়াস ক্রিগ আল-জাজিরাকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সীমিত কৌশলগত দিক’ বিবেচনা করলে ইরানের দ্বীপগুলো দখল করার মতো সামরিক সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। তাঁর মতে, পর্যাপ্ত আকাশ, নৌ ও উভচর সামরিক শক্তি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ছোট কোনো দ্বীপ দখল করতে পারে। তবে এর ফলে যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়বে, তা সামাল দেওয়ার সদিচ্ছা তাদের থাকতে হবে।
বর্তমানে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৫০ হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে। বড় ও স্থায়ী ঘাঁটির পাশাপাশি ছোট ছোট অগ্রবর্তী ঘাঁটিতেও এসব সেনা অবস্থান করছেন।
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির অধ্যাপক নাদের হাশেমিও আল-জাজিরার সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি জানান, শুধু দ্বীপ দখল করাই নয়; বরং সেখানে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার মতো সামরিক ও লজিস্টিক (রসদ সরবরাহ) সক্ষমতাও যুক্তরাষ্ট্রের আছে। কারণ, বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে সামরিক দিক থেকে তারা এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
তবে নাদের হাশেমি মনে করেন, আসল প্রশ্ন হলো, এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে কতটা মূল্য চোকাতে হবে।
কিংস কলেজের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ক্রিগ বলেন, ‘সাময়িকভাবে একটি দ্বীপ দখল করা এক জিনিস। কিন্তু সেখানে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা, রসদ সরবরাহ করা এবং সেখান থেকে কৌশলগত সুবিধা আদায় করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।’
ক্রিগ আরও উল্লেখ করেন, কেশম দ্বীপ দখল করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বেশ কঠিন হবে। কারণ, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়; বরং বেশ বড় একটি দ্বীপ, যা ইরানের মূল ভূখণ্ডের ঠিক গায়েই অবস্থিত।
হেঙ্গামের মতো ছোট ছোট দ্বীপ হয়তো সহজেই দখল করা যাবে। তবে এগুলো ইরানের গোলন্দাজ বাহিনী, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ছোট নৌকার বহরের নাগালের মধ্যেই থাকবে।
সহযোগী অধ্যাপক ক্রিগ বলেন, একসঙ্গে কয়েকটি দ্বীপ দখল করতে গেলে তা আর ‘সীমিত অভিযান’ থাকবে না। তখন এটি বড় ধরনের একটি উভচর সামরিক অভিযানে রূপ নেবে।
দ্বীপগুলো দখল করলেই যে ইরান হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলে বাধা দেওয়া বন্ধ করবে, এমন নয়। উল্টো এর ফলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো অরক্ষিত হয়ে পড়বে এবং সেগুলোতে টানা হামলা হতে থাকবে। একই সঙ্গে এ ঘটনা তেহরানের হাতে একটি বড় যুক্তি তুলে দেবে। তখন তারা যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ‘দখলদার শক্তি’ হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে পারবে।
এ ধরনের পদক্ষেপে প্রচুর জনবলের প্রয়োজন হবে। সহযোগী অধ্যাপক ক্রিগ ধারণা করেন, একটি সীমিত অভিযানের জন্যও শুরুতে ৫–১০ হাজার সেনার একটি বাহিনীর প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে লড়াকু সেনা, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, প্রকৌশলী, রসদ সরবরাহ, চিকিৎসাসেবা ও কমান্ড শাখার সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।
যদি একসঙ্গে কয়েকটি দ্বীপ দখলের পরিকল্পনা থাকে, তবে যুক্তরাষ্ট্রকে সেনার সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি করতে হবে। শুধু দখল নয়, এর পরের লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে গেলেও অতিরিক্ত সেনার প্রয়োজন হবে বলে ক্রিগ জানান।
ক্রিগ বলেন, ‘ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে ধেয়ে আসা সরাসরি হামলার মুখে মার্কিন সেনাদের কাজ করতে হবে। এ ছাড়া রসদবাহী জাহাজ, ল্যান্ডিং ক্রাফট ও হেলিকপ্টারগুলোকে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, মাইন ও কামানের গোলার ঝুঁকির মধ্য দিয়েই সমুদ্রপথ পাড়ি দিতে হবে।’
যুক্তরাজ্যের লন্ডনের কিংস কলেজের এই শিক্ষক আরও যোগ করেন, ‘ইরানকে যে তাৎক্ষণিক দ্বীপগুলো পুনর্দখল করতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। তারা শুধু অবিরাম হামলা চালিয়ে মার্কিন বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি বাড়িয়ে তুলতে পারে। এতে ওই অঞ্চলগুলো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং রাজনৈতিকভাবে বিব্রতকর অবস্থানে পরিণত হবে।’
ক্রিগ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র চাইলেই ওই সেনাদের রসদ সরবরাহ করতে পারে। তবে এ জন্য তাদের নিরবচ্ছিন্ন নৌ নিরাপত্তা ও আকাশপথে আধিপত্য বজায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে ইরানের আক্রমণ প্রতিহত করার ব্যবস্থাও চালু রাখতে হবে। তখন সেখানে টিকে থাকাই যুক্তরাষ্ট্রের মূল মিশন হয়ে দাঁড়াবে। নৌপথ সুরক্ষার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া একটি অভিযান খুব দ্রুতই ভূখণ্ড দখলের এক অন্তহীন যুদ্ধে পরিণত হতে পারে।’
যুক্তরাষ্ট্র আসলেই দক্ষিণাঞ্চলীয় কোনো দ্বীপ, বিশেষ করে খারগ দ্বীপ দখলের চেষ্টা করবে কি না, তা নিয়ে ‘যথেষ্ট সন্দেহ’ প্রকাশ করেছেন জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির অধ্যাপক হাশেমি।
অধ্যাপক হাশেমি বলেন, এর ফলে মার্কিন সেনাদের ব্যাপক প্রাণহানি ঘটবে। দেশের ভেতরেও এর চরম নেতিব