যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন মধ্যস্থতাকারীরা। উদ্দেশ্য, ক্রমেই প্রাণঘাতী হয়ে ওঠা পাল্টাপাল্টি হামলার চক্রে বিরতি টানা এবং সংঘাত যাতে আরও ছড়িয়ে বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ না নেয়, সেই পথ খোঁজা—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই গত সোমবার নিশ্চিত করেছেন, সংঘাত যাতে আর না বাড়ে, সে লক্ষ্যে মধ্যস্থতাকারীরা সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন, তবে এ বিষয়ে তিনি আর কোনো বিস্তারিত তথ্য জানাননি।

বিশ্বকাপ দেখতে আসা বাংলাদেশিদের ২২% কানাডায় অ্যাসাইলাম চেয়েছেন এখন পর্যন্ত আরও পড়ুন বিশ্বকাপ দেখতে আসা বাংলাদেশিদের ২২% কানাডায় অ্যাসাইলাম চেয়েছেন এখন পর্যন্ত

এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, কাতার, মিসর, পাকিস্তানসহ কয়েকটি আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কাছে একটি প্রস্তাব দিয়েছে। এতে ১০ দিনের জন্য লড়াই বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে গত মাসে দুই পক্ষের মধ্যে হওয়া অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্মারক আবার কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়ারও প্রস্তাব রয়েছে।

প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক নৌপরিবহন আবার চালু করার বিষয়টিও রাখা হয়েছে। কারণ, ওই প্রণালিতে উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ আলোচনার পথে অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে কূটনৈতিক এ উদ্যোগের মধ্যেই বাস্তব চিত্র ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই দেশই সংঘাত আরও বাড়ানোর দিকে এগোচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হামলা আর শুধু সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ নেই, ক্রমেই বেসামরিক অবকাঠামোও আঘাতের শিকার হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রকাশ্যে নিজেদের অবস্থানও আরও কঠোর করছে উভয় পক্ষ।

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আরও গভীরে বোমা হামলা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার ঘটনার জন্য ইরানকে ‘এর মূল্য দিতে হবে’। অন্যদিকে ইরানও এ অঞ্চলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তু এবং জাহাজ চলাচলের ওপর হামলা জোরদার করেছে।

সাম্প্রতিক এ উত্তেজনা এমন এক সময় দেখা দিয়েছে, যেখানে এক মাস ধরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্ক ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছিল। এর মাধ্যমে এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হয়। সেই সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে আলোচনার একটি রূপরেখাও নির্ধারণ করা হয়।

২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ যুদ্ধ। তবে এর পর থেকে দুই দেশই বারবার একে অপরের বিরুদ্ধে ওই সমঝোতা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে।

এখন প্রশ্ন, সামরিক পরিস্থিতি কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে ছাপিয়ে যাওয়ার আগেই মধ্যস্থতাকারীরা কোনো এক পক্ষকে পিছু হটতে রাজি করাতে পারবেন কি না।

সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পাঠানো কয়েকটি প্রস্তাব তেহরান পেয়েছে।

বাঘাই বলেন, ‘এ মুহূর্তে প্রস্তাবগুলোর বিস্তারিত নিয়ে কথা বলতে চাই না।’ একই সঙ্গে বাঘাই স্পষ্ট করে দেন যে কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও ইরানের সামরিক প্রতিক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।

সর্বশেষ প্রস্তাবটি ১১ জুলাই ওমানের রাজধানী মাসকাটে ওমান, ইরান ও কাতারের মধ্যে হওয়া আলোচনার ভিত্তিতে তৈরি, তবে শেষ পর্যন্ত সে আলোচনা ভেঙে যায়।

প্রস্তাবটির কেন্দ্রবিন্দু হরমুজ প্রণালি। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এ জলপথ দিয়েই পরিবহন করা হয়ে থাকে।

প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালির দুটি নৌপথই পুরোপুরি খুলে দেওয়ার কথা রয়েছে। একটি হলো, ইরানের অনুমোদিত উত্তরাঞ্চলীয় নৌপথ, যা বর্তমানে মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধের মুখে। অন্যটি যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত দক্ষিণাঞ্চলীয় নৌপথ, যেখানে ইরানের হামলার শিকার হয়েছে বিভিন্ন জাহাজ।

এ ছাড়া প্রস্তাবের অধীন, সমঝোতা স্মারকটি রক্ষা করার জন্য আলোচনার টেবিলে মধ্যস্থতাকারীদের পর্যাপ্ত সময় দিতে ১০ দিনের জন্য সব ধরনের সামরিক অভিযান স্থগিত রাখা হবে।

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ নৌপথ দিয়ে ভবিষ্যতে জাহাজ চলাচলের ট্রানজিট ফি বা পারাপার মাশুল কীভাবে পরিচালনা করা হবে, তা নিয়েও আঞ্চলিক কর্মকর্তারা আলোচনা করছেন। এর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার অধীন একটি যৌথ তহবিল গঠন করা অথবা সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টির সঙ্গে সংগতি রেখে ইরানকে একটি ‘যৌক্তিক সেবা মাশুল’ আদায়ের অনুমতি দেওয়া।

এ উদ্যোগ কি আসলেই সফল হতে পারে

যুক্তরাজ্যের ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সাইমন ম্যাবন বলেন, এ সমঝোতা স্মারকটি শুরুতে লড়াই কমিয়ে আনতে সফল হয়েছিল। কারণ, এটি ইচ্ছা করেই কিছুটা অস্পষ্ট রাখা হয়েছিল, যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় পক্ষই এটিকে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করার এবং মেনে নেওয়ার সুযোগ পায়। তবে তিনি উল্লেখ করেন, এ নমনীয়তাই পরে চুক্তিটির দুর্বলতা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

অধ্যাপক ম্যাবন আল-জাজিরাকে বলেন, এ ‘মৃতপ্রায়’ চুক্তির ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যার সুযোগ থাকায় উভয় পক্ষই দাবি করার সুযোগ পেয়েছে যে তারা শর্ত মেনেই কাজ করছে, আর একই সঙ্গে একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে। শেষ পর্যন্ত এটিই চুক্তিটি ভেস্তে যাওয়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

এই অধ্যাপক আরও বলেন, ‘তাই নতুন যেকোনো চুক্তিতে সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে, যাতে একই ধরনের বিরোধের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।’

সাম্প্রতিক সময়ে সামরিক সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধি এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ম্যাবন বলেন, ইরান এখনো হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে তাদের অন্যতম প্রধান কৌশলগত হাতিয়ার বা শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে।

অন্যদিকে, গত সপ্তাহে তিনজন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার ঘটনাটি ইরানের ওপর জোরালো পাল্টা আঘাত হানার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর চাপ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। ম্যাবনের মতে, এ পরিস্থিতি উভয় সরকারকে প্রতিশোধের এমন এক চক্রে আটকে ফেলার ঝুঁকিতে ফেলেছে, যাকে তিনি ‘উত্তেজনার ফাঁদ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে কিছু বিশ্লেষকের মতে, বিমান হামলা জোরদার করা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র এখনো একটি বড় যুদ্ধ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে,