যুক্তরাষ্ট্রে হামের সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। চলতি বছরের অর্ধেক এখনো শেষ হয়নি, এরই মধ্যে দেশটিতে ১৯৯১ সালের পর সর্বোচ্চসংখ্যক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। ফলে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো নতুন রেকর্ড গড়ল সংক্রমণ।

সিএনএনের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে ২০০০ সালে হাম নির্মূল ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু গত ১৮ মাসে যত মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে, তা আগের ২৫ বছরের মোট আক্রান্তের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।

শিল্প, জলবায়ু ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তিকে একসূত্রে আনল ‘দ্য তত্ত্বমসি সার্কেল’ আরও পড়ুন শিল্প, জলবায়ু ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তিকে একসূত্রে আনল ‘দ্য তত্ত্বমসি সার্কেল’

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) প্রতি সপ্তাহেই নতুন আক্রান্তের তথ্য প্রকাশ করছে। ২০২৫ সালে শুরু হওয়া একাধিক প্রাদুর্ভাব ২০২৬ সালেও চলমান রয়েছে। একই সময়ে নতুন নতুন সংক্রমণ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বড় আকারের প্রাদুর্ভাব সৃষ্টি করেছে।

আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসের সভাপতি ড. অ্যান্ড্রু রেসিন বলেন, এটি মূলত জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং এটি এড়ানো সম্ভব ছিল। হামে আক্রান্তদের বেশির ভাগই শিশু এবং প্রায় সবাই টিকাবিহীন।

বিজ্ঞাপন

সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২ হাজার ৩০০ জন হামে আক্রান্ত হয়। ২০০০ সালে রোগটি নির্মূলের ঘোষণার পর এটিই ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ বছর এবং আগের বার্ষিক গড়ের প্রায় ১২ গুণ বেশি।

কিন্তু চলতি বছর সেই রেকর্ডও ভেঙে গেছে। আজ শুক্রবার পর্যন্ত প্রকাশিত সিডিসির তথ্যে দেখা যায়, ২০২৬ সালে ইতিমধ্যে অন্তত ২ হাজার ৩১৮ জন আক্রান্ত হয়েছে। বছরের এখনো পাঁচ মাসের বেশি সময় বাকি থাকায় এই সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

২০২৬ সালের অধিকাংশ সংক্রমণই গত বছর শুরু হওয়া প্রাদুর্ভাবের ধারাবাহিকতা। যেমন—সাউথ ক্যারোলিনার প্রাদুর্ভাব এপ্রিল পর্যন্ত চলেছে। একইভাবে উটাহ ও অ্যারিজোনার সীমান্তবর্তী এলাকায় এক বছরের বেশি সময় ধরে সংক্রমণ চলছে। এর পাশাপাশি চলতি বছর নতুন করে আরও ৩৫টি অঙ্গরাজ্যে প্রাদুর্ভাবের ঘটনা ঘটেছে এবং সাতটি অঙ্গরাজ্য ছাড়া প্রায় পুরো দেশেই হাম শনাক্ত হয়েছে। সিডিসির তথ্যে দেখা যায়, আক্রান্ত ব্যক্তিদের ৯০ শতাংশের বেশি হয় টিকা নেয়নি, নয়তো তাদের টিকাদানের তথ্য জানা যায়নি।

এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা নভেম্বরে বৈঠকে বসছেন বলে জানা গেছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র এখনো হাম নির্মূল দেশের মর্যাদা ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নতুন করে মূল্যায়ন করা হবে।

চলতি বছর সবচেয়ে বেশি হাম শনাক্ত হয়েছে দক্ষিণ ক্যারোলিনায়। স্পার্টানবার্গ কাউন্টিতে ২০২৫ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া প্রাদুর্ভাব চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত চলেছে। এতে প্রায় এক হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়, যা কয়েক দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এই প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রের কাছেই ছিল স্পার্টানবার্গের ইউনিটারিয়ান ইউনিভার্সালিস্ট চার্চ।

চার্চটির যাজক স্কট নিলি জানান, শুরুতে তিনি মনে করেছিলেন বিষয়টি তাঁদের ওপর প্রভাব ফেলবে না। কিন্তু ২০২৬ সালের প্রথম শুক্রবার দক্ষিণ ক্যারোলিনার স্বাস্থ্য বিভাগ তাঁকে জানায়, বড়দিন উপলক্ষে চার্চে আয়োজিত অনুষ্ঠানে হামে আক্রান্ত একজন ব্যক্তি উপস্থিত ছিল। এতে সেখানে থাকা বহু মানুষ সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে।

স্কট নিলি আরও জানান, ঘটনাটি তাঁকে বুঝিয়েছে সমাজ কতটা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। জাতীয় পর্যায়ে আলোচিত একটি প্রাদুর্ভাব তাঁর বাসস্থানের আশপাশেই চলছিল, অথচ শুরুতে সেটির কোনো প্রভাব তিনি টের পাননি।

স্বাস্থ্য বিভাগ চার্চ কর্তৃপক্ষের কাছে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ব্যক্তিদের তালিকা চাইলেও এমন কোনো তালিকা ছিল না। কারণ, এটি ছিল উন্মুক্ত আয়োজন, যেখানে যে কেউ অংশ নিতে পারত।

পরে চার্চের এক সদস্যের তোলা একটি ছবি ব্যবহার করে উপস্থিত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়। এরপর তাদের যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহ করে স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে দেওয়া হয়, যাতে দ্রুত সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়। নিলি বলেন, এরপর আর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েনি। তাঁর ধারণা, চার্চের সদস্যদের মধ্যে টিকাদানের হার খুব বেশি থাকায় এটি সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, ঘটনাটি প্রমাণ করেছে টিকা কার্যকর এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বড় ধরনের সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দক্ষিণ ক্যারোলিনায় নিলির কাছে আসা ফোনকলের মতো হাজারো কল করতে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন হাম রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত, পরীক্ষা ও নজরদারির কাজ কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত চলতে পারে।

সান ফ্রান্সিসকো জনস্বাস্থ্য বিভাগের সংক্রামক রোগ কর্মসূচির মেডিকেল পরিচালক ড. ফ্যারেল টোবোলোভস্কি বলেন, এপ্রিল মাসে মাত্র দুজন হাম রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতেই তাঁদের প্রায় সব তদন্তকারীকে কাজে নামাতে হয়েছিল। তিনি বলেন, বর্তমানে জনস্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। এখন একসঙ্গে একাধিক বড় সংক্রমণ মোকাবিলা করা তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।

ভার্জিনিয়ায় বছরের শুরুতে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন সংক্রমণ আন্তর্জাতিক ভ্রমণ বা অন্য অঙ্গরাজ্য থেকে আসা ব্যক্তিদের মাধ্যমে ছড়িয়েছিল। তখন টিকাদানের হার বেশি থাকায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েনি। কিন্তু মে মাসে এমন এক ব্যক্তির শরীরে হাম শনাক্ত হয়, যিনি অঙ্গরাজ্যের বাইরে যাননি। এরপর শুরু হয় বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব। এখন পর্যন্ত ওই প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে ১৫০টির বেশি নতুন সংক্রমণ হয়েছে।

ভার্জিনিয়া স্বাস্থ্য বিভাগের টিকা প্রতিরোধযোগ্য রোগ সমন্বয়কারী মেরেডিথ রবিনসন বলেন, স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে হাম সম্পর্কে সচেতন করছেন, আক্রান্ত পরিবারের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন এবং চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোকে প্রস্তুত রাখছেন। অন্য অঙ্গরাজ্যের অভিজ্ঞতা থেকেও তাঁরা উপকৃত হয়েছেন বলে জানান তিনি।

ভার্জিনিয়ায় স্থানীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্য বিভাগ যৌথভাবে একটি মোবাইল স্বাস্থ্যসেবা দল গঠন করেছে। কেউ চাইলে এই দল বাড়িতে গিয়ে হাম পরীক্ষা, প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে। এতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের হাসপাতালে না গিয়েও দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো এল